বারান্দায় জানলাটা দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম রাস্তাটার দিকে। ব্যস্ত শহর। হাজার হাজার গাড়ী আলো জ্বালিয়ে ছুটে চলেছে গন্তব্যে। এক পলকে দেখতে দেখতে যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম কোথায়। মনটা হঠাৎ ভারী হয়ে আসতে লাগল। চোখের সামনে হঠাৎ যেন দেখতে পেলাম কয়েকজন মানুষ হেঁটে এগিয়ে আসছে। তাদের মাঝখানে আমি। তারা ভাসতে ভাসতে যেন আমার সামনে এসে দাঁড়াল।সকলে পা মুড়ে বসলো আমার সামনেটাতেই। আমিও বসলাম। মানে সেই আমার সামনের আমি। হাঁটু মুড়ে বসে আমি বলতে লাগলাম এই পৃথিবীর উদ্দেশ্যে,এই মাটির,এই বাতাস এই জলের উদ্দেশ্যে। কি বলছি আমি? আরও মন দিয়ে শুনতে লাগলাম- হে পৃথিবী,আজ আমরা তোমার সামনে conface করছি,আমরা তোমার অপরাধী। আমাদের তুমি শাস্তি দাও। আমরা মানুষ তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থী। সেই জন্মের মুহূর্ত থেকে,তোমার কত অক্সিজেন ধার করেছি,কত জল পান করেছি, তোমার ওপর ভর দয়ে হেঁটেছি,খেলেছি,ছুটেছি। কিন্তু তুমি তো কিছু বলোনি কখনও। দাম চাওনিতো কখনও।এখন জল চাইলেও টাকা লাগে। তোমার থেকে কত গ্যালনই না জল নিলাম। কিছুতো চাইলে না। অক্সিজেনের দাম লাগে আমাদের হসপিটাল নার্সিং হোমে। তোমার থেকে কত সিলিন্ডার যে অক্সিজেন নিলাম। এক টাকাও নিলে না। তবে অবশ্য নেবেই বা কেন,চাইবেই বা কেন। টাকার যে কি মূল্য তা তো তুমি জানই।কারণ “টাকা মাটি মাটি টাকা”, আর এই মাটিই যে তোমারই গো। কিন্তু আমরা তোমাকে কি দিয়ে এই বিরাট ঋণ শোধ করি? আমরা তোমাকে কি দিয়েছি? আমাদের বর্জ্য পদার্থ,মলমূত্র,শ্লেষ্মা,অক্সিজেনের বিনিময়ে কার্বনডাই অক্সাইড,আর? আমরা মানুষ। না না,আমরা উন্নত বুদ্ধিজীবী মানুষ। আমরা থাকার জন্য ঘর বানিয়েছি তোমার বুকে দাগ দিয়ে। তোমার ওই যে আকাশ, যে আকাশে একসময় প্রাণ খুলে উড়ে বেড়াত হাজার হাজার পাখি,তারা প্রাণ বাঁচাতে,ঘর বাঁচাতে কোথায় চলে গেছে। কি করি বল, আমরা উন্নত সভ্যতার মানুষ, তাদের আবর্জনা যে আমাদের কাম্য নয়। আমরা কত বড়ো বড়ো কারখানা বানিয়েছি দেখ। কত উন্নত প্রযুক্তি। কিন্তু দুঃখিত গো,ওই কালো ধোঁয়া মিশিয়েছি তোমারই সেই বাতাসে,যা তুমি বিনি পয়সায় আমাদের দিয়ে গেছো এবং আজও যাচ্ছ বাঁচার জন্য। তবে……তবে আর কতদিন দিয়ে যেতে পারবে জানিনা। আমাদের উন্নতি যেভাবে বাড়ছে। জানি ওই সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির হাত থেকে বাঁচিয়েছো তোমার ওজন দিয়ে। না না ওজন মানে weight নয় গো। ওজন গ্যাস। দেখ আমরা কত কিছু শিখে গেছি। এটাও আবিষ্কার করতে পেরেছি। তুমি না জানানো সত্ত্বেও। কিন্তু এত শিখেও একটা ভুল হয়েছো জানো। তোমার অনুমতি ছাড়াই তোমার দেওয়া সেই সুরক্ষা ভেঙে ফেলতে শুরু করেছি। তুমি চেষ্টা করে যাচ্ছ তোমার সন্তানদের বাঁচাতে, আপ্রাণ চেষ্টা করছো। কিন্তু…..সন্তানরা যদি মার কথা না
মানে। মা কি করে বল। সন্তান যে উন্নত গো, শিক্ষিত। ওই যে পাখিদের কথা বলছিলাম, চড়ুই গুলো কোথায় চলে গেল। কি করি বল, দূরত্ব যে কমাতে হবে, পরস্পরকে কাছে আনতে হবে। শিক্ষিত মানুষ যে আমরা। তাতে যদি প্রাণী সম্প্রদায় মরে,মরুক। মোবাইল বানিয়েছি গো আমরা। বড় বড় টাওয়ার, যেগুলো তোমার বুকে পুঁতেছি শূলের মতন, সেই টাওয়ার মারছে চড়ূই। কি করে? ইস। সে তুমি বুঝবে না গো।অনেক পড়াশুনো লাগবে।আমরা শিক্ষিত, তাই বুঝি। জানো, সেদিন ফসল মাঠের পাশ দিয়ে আসছিলাম।ফসলগুলো যেন কেঁদে কেঁদে বলল আমাদের সুস্থ মাটি সুস্থ জল দাও। আমাদের হরমোনের ইনজেকসন দিয়ে please মোটা করোনা। দম আটকে আসে। আর দেখো ওই যে জলের কথা বলুছিলাম শুরুতে, আমরাই তোমার পরিশুদ্ধ জলের সব শুদ্ধতা কেড়ে নিচ্ছি। কি করবো,রা সায়ানিক সার দিলে ফসল বেশী বড় বেশী ভাল হলে বেশী টাকা আসবে। সেটাই তো আসল আমাদের কাছে। তোমার জল তাতে একটু খারাপ হলে হোক। তুমি নিজেই শুদ্ধ করে দিও। এতদিন করেও আসছো। কত ভাল গো তুমি। এত অপরিষ্কার জলও যখন বাস্প করে ছড়াও বারিধারা, আহা, কি সুন্দর সেই জল।একটুও বিষ মিশে থাকে না। কি করে যে কর। sorry গো। তখন বলছিলাম,আমরা শিক্ষিত, তুমি বুঝবে না, এত দেখছি তুমি আমাদের থেকে অনেক অনেক বেশী শিক্ষিত। আমরা নোংরা করছি আর তুমি আমাদের দোষ মাফ করে যাচ্ছ। যতটা পারছো শুধরে নিয়ে আমাদের বাঁচার ব্যবস্থা করে চলেছো। কিন্তু কতদিন পারবে ?তোমার ভেতর থেকে লোহা,কয়লা,তেল,সোনা রূপা যা পেয়েছি সবই কেড়ে নিয়েছি নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য। কি করব বল, সভ্যতা উন্নত করতে এসব তো লাগবেই। কিন্তু ভেবোনা সব তুমিই পাবে,এ যে তোমারই সম্পদ। কেউ নিয়ে নিতে পারবে না। আরে যতই ক্ষমতা হোক আমাদের যতই শিক্ষিত হই, মৃত্যুকে তো পারিনি জয় করতে। মরবো তো সকলেই একদিন। ওই যে কেড়ে নিলাম সোনা, নিয়ে তো যেতে পারবোনা একটুকরোও। সবই তোমার। আমরা তো বোকার মত এটা আমার ওটা আমার করে মরি। কাড়াকাড়ি,মারামারি,খুনোখুনি করি। তাতেও তোমার বুকের ওপর নানা অপরাধে মেতে উঠি। কত বোকা না আমরা,ইস। তুমিই বুঝবে গো তোমার এই সন্তানরা কি মানুষ হয়েছে। তুমি চেয়েছিলে কিন্তু মানুষ করতে।আরে আমরা তো মানুষই, শিক্ষিত সভ্য মানুষ।
আজ আমরা বুঝেছি নিজেদের দোষ,অপরাধ। কিন্তু আজ যে কিছু করার নেই। এতদিনের এত ক্ষয়ক্ষতি কি শোধরানো যায়? শুধু অনুশোচনা,আত্মসমালোচনা আর ক্ষমাভিক্ষা। আর যে কিছুই করার নেই। পারলে আমাদের ক্ষমা করো। হয়তো ভাবছো আমাদের তোমার বুকে ঠাঁই দেওয়াটাই ভুল হয়েছে। হয়তো তাই সত্যি। জন্তুগুলো আমাদের মত উন্নত নয়,শিক্ষিত তো নয়ই। তারাও কিন্তু এই জল,মাটি এতকিছুকে এভাবে অপব্যভার করতে পারেনি যা আমরা করেছি। কি করবো বল,সভ্যতাকে যে উন্নত করতে হবে। কিন্তু সত্যি আজ আমরা দঃখিত। তাই আজ আমরা এসব বললাম। নিজেদের অনেক হাল্কা লাগছে হে পৃথিবী। কি ভাবছো? একটু হলেও এবার মানুষ হতে পেরেছি না? সভ্য,শিক্ষিত মানুষ?
Leave a Reply