“ওম”
দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য
মুখবন্ধ
(ভূমিকা লিখতে বসে আমি যা দেখলাম যে সেটাতেই একটা ছোটখাটো বই হয়ে যাবে। তাই তাকেও আবার বহু কষ্টে সংক্ষিপ্ত করে আমি ঠিক করলাম এমন এক ধরনের মুখবন্ধ লিখি যা হয়েতো আজ অবদি কোন গ্র্যন্থে রচিত হয়েনি। আমি ভূমিকাটিকেও কয়েকটি পর্বে ভেঙ্গে দিলাম। কারন আমার এই গ্রন্থ রচনার যে উদ্দেশ্য তা বিরাট। বিপুল। যার ব্যপারে বলতে গেলে কম পরিমান স্থানে তা সম্ভব নয়। আর তাছাড়া এই গ্রন্থ যাদের মূল উদ্দেশ্য করে লিখতে চলেছি তাদের মনস্তাত্মীক স্তর ভিন্ন। তাই আমি কয়েকটি পর্বে ভেঙ্গে দিয়েছি আমার গ্রন্থে ভূমিকা।)
যারা নিজেদের নাস্তিক বলে গর্ব করেন তাদের জন্যে।
আমি সনাতন ধর্মে জন্মগ্রহন করেছি। এ আমার পরম সৌভাগ্য। আমি জানি সে কথা, কিন্তু আরও পাঁচজন সনাতন ধর্মে জন্মগ্রহন করা মানুষ কি তা মানেন? সনাতন ধর্ম, যাকে আমরা হিন্দু ধর্ম বলেও জানি, একথাই হয়েত অনেকের জানা নেই, নিজের ধর্মটার মুল কথা জানা তো দুরঅস্ত। আমি একজন হিন্দু হওয়ার যে সৌভাগ্যের কথা বলছি, সকলেই কি তা মন থেকে মানেন যে তিনি হিন্দু হয়ে জন্মেছেন এ তার পরম সৌভাগ্য? কেন মানেননা জানেন? আপনি হিন্দু বা সনাতন ধর্মের যে কি মহানতা, এর ভেতরে যে কি অপরিসীম, অকল্পনীয় বিজ্ঞান ও জীবনচেতনা লুকিয়ে আছে তা আপনাদের জানা নেই। কখনো জানার চেষ্টাটুকুও কি করে দেখেছেন? কোন মহান ব্যাক্তি বা হিন্ধু ধর্মের সম্পর্কে প্রগার জ্ঞান আছে এমন কোন মানুষের কাছে বসেছেন কি সৎসঙ্গ করতে? তবে কিভাবে জানবেন এই মহান ধর্মের মহানতা। যেখানে সামান্য কোন অজানা বিষয় সম্পর্কে জানতেই আমাদের ওপরের সাহায্য নিতে হয় সেখানে কিভাবে আপনি এই সৎসঙ্গ ছাড়া সেই মহানতার আন্দাজ পাবেন? অনেকে হয়েতো বিজ্ঞানের কিছু তথ্য জেনে নিজেকে এতোটাই পন্ডিত ভাবছেন যে আসল বিজ্ঞানটিকেই শুধু কিছু কুসংস্কার আর মিথ্যা বিশ্বাস ভেবে উড়িয়ে দিলেন। কিন্তু ভেবে দেখুন আপনি সেই বিজ্ঞানটুকু জেনে কিন্তু মহান কিছু করতেও পারেননি। যদি আইনস্টাইনের মতন কোন একজন হতে পারতেন তবুও বুঝতাম আপনার জ্ঞান সার্থক। কই তাওতো হলনা। কেন হয়েনি জানেন? কারন আপনার জ্ঞানে অনেক ফাঁক থেকে গেছে। আইন্সটাইন নিজেও কিন্তু ঈশ্বরের শক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। কারন? কারন যা আসল জ্ঞান তাই যদি না পান তবে জ্ঞাণী হলেন কিকরে? তবে আপনার এই যে ধর্মের প্রতি বিরূপ ভাব তার কারনও অস্বীকার করিনা। সত্যজ্ঞানের অভাবেই এই জগতে সৃষ্টি হয়ে এসেছে একের পর এক কুসংস্কার। মানুষ অন্ধকারে দুবে থাকছে আর সেই সুযোগের সদ্ব্যাবহার করে জন্ম নিয়েছে হাজার হাজার লোক ঠকানো জ্যোতিষী, তান্ত্রিক, বাবা ইত্যাদি। যেখানে জ্যোতিষ শাস্ত্র একটি অতি উন্নত বিজ্ঞান সেখানে এই সমস্ত ভন্ড মানুষদের নিচ মানসিকতা, ও লোভের কারনে সেই অতি উত্তম শাস্ত্রকে ভুল কাজে ব্যাবহার করার ফলে আজ মানুষ সেই শাস্ত্রকেও অবহেলা করছে। জ্যোতিষের কথা শুনলেই তাই আজ শিক্ষিত মানুষরা জ্যোতিষশাস্ত্রের কত শক্তি, কত উন্নত সেই বিজ্ঞান তা না জেনেই, বা তার বিচার বিশ্লেষন না করেই তাকে অবজ্ঞা করতে শিখেছে। আর এর ফলেই ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়েছে ধর্ম, শাস্ত্র ইত্যাদির প্রতি মানুষের অণীহা। আর এর জন্যে দায়ী সেই সব পাষন্ড, ধর্মের নামে নিজের স্বার্থসিদ্ধি চরিতার্থ করতে তৎপর লোভী মানুষের দল। এখন আবার নতুন একটি সমস্যা। সব জ্যোতিষীই তবে লোভী বা ভুল? না তাও নয়। অনেক ভালো মানুষ আজও এই পৃথিবীতে আছেন। তা না থাকলে আজও একটি লোক রোদে মাথা ঘুরে পরে গেলে বা ট্রেনে উঠতে গিয়ে পরে গেলে দশজন মানুষ তাকে সাহায্য করতে, তাকে ধরতে ছুটে আসত না।
দেখুন আপনি নিজেকে নাস্তিক মানেন, কিন্তু আপনি কি নিজেকে বিশ্বাস করেননা? করেনতো? তাহলে কিকরে বলেন “আমি ধর্ম মানিনা”? আমাদের ধর্মের তো এটাই শুরু থেকেই শিক্ষা যে নিজেকে চেন। আত্মজ্ঞান না জন্মালে, নিজেকে না চিনলে ধর্ম মানা হয়েনা। তাহলে আপনিতো না জেনেই ধর্ম মেনে বসে আছেন। আচ্ছা, আপনি আপনার গুরুজনদের শ্রদ্ধা করেননা? তাহলে কিকরে বললেন শাস্ত্র মানেন না? শাস্ত্রেতো একথাই লেখা আছে। আপনি কি চান, সমস্ত মানুষ নিজেদের মধ্যে মারামারি করে মরে যাক? এই পৃথিবী শ্মশানপুরিতে পরিনত হোক? নিশ্চয়ই চাননা? তাহলে কিকরে বলেন শাস্ত্র, ধর্ম মানিনা। কারন সেখানেতো পরস্পকে প্রেম ভালোবাসার কথাই বলা হয়েছে বারে বারে। কি, তাও হচ্ছেনা? আসলে তাও মানবেননা কারন আপনার মাথায় তো ঢুকে আছে সেইসব কথাগুলো যা কোন শুভ বিচারের মাধ্যমে বিচার না করে, কিছু ভুল বিচারে আপনার কাছে পৌঁছেছে। ভেবে দেখুন, আপনি হিন্দু ধর্মের নানা গোঁড়ামির কথাই জানলেন আর তা দেখে ভেবে বসলেন যে এই ধর্ম শুধু ভ্রান্ত কিছু ধারনা, গোঁড়ামি আর কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। আসল বিষয়সমুহ জানার প্রয়োজনটুকু ভুলে। কিন্তু ভেবে দেখুনতো আপনি কি গোঁড়া নন? কুসংস্কারী নন? যেখানে আপনি কোন বড়সড় বিজ্ঞানি না হয়েও কিছু বিজ্ঞানের কথা যেনে ধর্মকেই মানতে চাননা, চোখে দেখেননা বলে ভগবানকে মানতে চাননা, আপনি কি গোঁড়ামি করছেননা? আচ্ছা, আপনি মোবাইল ব্যাবহার করেন। আপনাকে যদি বলি আপনার মোবাইলটায় যে তরঙ্গের মাধ্যমে কথাগুলো পৌঁছচ্ছে, আপনি কি আমায় দেখাতে পারবেন? খালি চোখে? কোন যন্ত্র ব্যাবহার ছাড়াই? পারবেন কি? পারবেন না?যাঃ। যা মানুষের তৈরী বস্তু, যার প্রতিটি বিষয় বিজ্ঞানের হস্তগত, তাও আপনি দেখাতে পারছেননা কোন কিছুর সাহায্য ছাড়া খালি চোখে, তাহলে যিনি স্বর্বশক্তিমান, তাঁকে আপনি খালি চোখে দেখতে চান কিভাবে? হ্যাঁ তাও সম্ভব। কিকরে? যেমন আপনি আপনার কোন যন্ত্রের মাধ্যমে আপনার ওই মোবাইলের তরঙ্গ দেখাতে পারবেন ঠিক তেমন করেই। এখানে আপনাকে যে যন্ত্রটি ব্যবহার করতে হবে তার নাম “আধ্যাত্মিকতার জাগরন ও উন্নতি”। আর সেই পথেই আপনি সব প্রশ্নের উত্তর পাবেন, বা যাকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননা, তাঁকে জানতে পারবেন। তখন দেখবেন আপনি যা জানতেন তার থেকে আরোও কত কিছু জানলেন। শুধু কষ্ট করে এই গ্রন্থ পরুন একটি বাজে গল্পের বই পরে সময় নষ্ট করছেন ভেবেই পরুন। ভগবান আপনাকে সুমতি দিন।
যাঁরা আস্তিক, ধর্ম মানেন, কিন্তু মনে অনেক প্রশ্ন, সংশয় তাদের জন্যে।
আপনি ভক্তিপরায়ন, ধর্মপরায়ন মানুষ। কিন্তু একি? আপনার তো অনেক বিষয়ই জানা নেই। আপনি কি জানেন আমাদের সনাতন ধর্মও একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী? আমাদের ধর্মেও একজনই ভগবান। যিনিই পরমপুরুষ, পরমাত্মা। এখন আপনার মনে প্রশ্ন এলো তা কি করে হয়? তবে যে আমরা এত দেবদেবীর পূজা করি? বার মাসে তের পার্বন যে লেগেই থাকে। কিকরে একজন ভগবান হয়? দেখেছেন তো। আপনি ভক্তিবান হয়েও এই বিষয়ই এখন অবগত নন। এখন আবার আপনার মনে প্রশ্ন জাগছে, যদি ভগবান একজনই হবেন তাহলে কেউ কৃষ্ণকে তো কেউ কালী কে, কেউ শিবকে তো কেউ গনেশকে পূজা করেন কেন? সবাই বলে “তোমার কর্ম তুমি কর মা”, তাহলে মা-ই যদি সব কর্ম করছেন তবে কর্মফল আমাদের ভোগ করতে হয় কেন? ভগবানই যদি কর্তা হন তবে গীতায় আমাদের কর্ম করার কথা বলে গেলেন কেন? এই ধরনের নানান প্রশ্নে আপনারা জর্জরিত তাইতো। আর এই সব প্রশ্নগুলিই এত মারাত্মক যার উত্তর পেয়ে গেলে আপনি যে ভগবানকে চিনবেন তা হল পরম শান্তির প্রধান উৎস। আমার মুল উদ্দেশ্য আমাদের সনাতন ধর্মের আসল সারটিকে তুলে এনে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। অনেকের মনে এধরনের অনেক বিষয় হাজারও প্রশ্ন থাকলেও তাঁরা হয়েতো কোন মহান ব্যাক্তি বা সতগুরুর সান্যিধ্য পাওয়ার সুযোগ পাননা। কিম্বা হয়েতো কোন শাস্ত্র গ্রন্থ পরে বিষয়গুলিকে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে ভাষার কঠিনতা ও সাধারন মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহার হয়েনা সে ধরনের উন্নত ভাষার ব্যাবহারের কারনে অনেকের কাছে সেই সব গ্রন্থের আভ্যন্তরীণ অর্থ সম্পূর্নরূপে গ্রহন করা সম্ভব হয়েনা। ভগবানের পরম ইচ্ছায় আমি তাই সচেষ্ট হয়েছি সেইসব জ্ঞানপিপাসু মানুষদের কাছে সহজ সরল ভাবে আমাদের মহান ধর্মের মুল সার বস্তুটিকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে। যাতে তারপর তারা সেই শাস্ত্র গ্রন্থ পরে সহজে বিষয়গুলি অনুধাবন করবার মত সামর্থ পেতে পারেন। এই আমার ইচ্ছা। ভগবান আমার সহায় হোন যাতে এই কাজে সফলতা পেতে পারি। এই গ্রন্থ পরে আপনাদের কোন প্রকারের আত্মোজ্ঞান বৃদ্ধি হলে, আত্মোন্নতি হলে অথবা আধ্যাত্মিক চেতনার বৃদ্ধি হলেই আমার কাজ সার্থক মনে করব। ভগবান সকলের মঙ্গল করুন।
সকলের জন্যে
শাস্ত্রের কথা লিখবার আমি কে? আমি নিজে কতটুকু শাস্ত্র জানি? বা জানতে পেরেছি যে আমি তা নিয়ে আলোচনা করব? কথাটা সত্যি বটে। তবে ভগবানের কৃপায় সব হয়ে এটা আমি মানি। আর আমি শাস্ত্র নিয়ে কোনরূপ আলোচনা করতেও বসিনি বা শাস্ত্র নিয়ে লেখা তো দুরঅস্ত। তবে? এ যুগ বিজ্ঞানের বিপুল অগ্রগতির যুগ। যেসকল মানুষ এযুগে শাস্ত্র জানেন এবং মানেন বা পালনও করেন তাদের আমি আর কি শাস্ত্র জ্ঞান দেব? যেখানে আমি নিজে বা কতটুকু জেনেছি? তাই তাঁদের আমার সে জ্ঞান দেওয়ার কোন অধিকারই নেই। কিন্তু বিজ্ঞান মনষ্ক আজকের প্রজন্ম বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমি শুধু জানাতে চাই যে আমাদের ধর্ম ও শাস্ত্রে কি মহান বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে। তাই তথাকথিত শাস্ত্র না লিখে আমি লিখতে চলেছি বিজ্ঞান্মুখি শাস্ত্রের ব্যখ্যা। যা আমাদের ধর্মের মুল শক্তি, মূল জ্ঞানের ব্যখ্যা দিতে পারবে সেইসব বিজ্ঞানমুখি মানুষদের যারা আমাদের শাস্ত্রের কথায় ভন্ডামি, গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং তৎসহ দেবদেবীদের প্রতি কিছু কাহিনী জেনে দ্বিমতও প্রকাশ করে থাকে যে তারা যদি এই কাজ করেন তো আমরা কেন করলে দোষ। তাই আমি একেবারে সাধারন সেইসব ছেলেমেয়ে ও মানুষদের কথা ভেবেই এই গ্রন্থ লিখছি। কারন তারাই আমাদের ভবিষ্যত। এই ভবিষ্যতকে, তার ভীতকে শক্ত করতে গেলে তাদের অবষ্যই আমাদের ধর্মের মুল কথা ও তৎসহ মহান বিজ্ঞানের কথা জানান প্রয়োজন বলেই আমার ধারনা। আমাদের ধর্মের সম্পর্কে জানার স্তর নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমি অনেকগুলি ভাগ পেয়েছি। যেমন একেবারে শুরুতে এমন অনেকে আছেন যাঁরা এটাও জানেন না যে আমাদের ধর্মেও একটিই ভগবান। তিনি পরমেশ্বর। তিনিই ব্রহ্ম। তাঁরা একথা শুনেছেন যে আমাদের ধর্মে নাকি তেত্রিশ কোটি দেবতা। আবার একটি প্রশ্ন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের মাথায় আসে ও খটকা লাগে যে আমাদের ধর্মে এত দেবদেবী কেন? তবে কার পূজো করা বেশি শ্রেয়? তাদের কি বলি? এই অবস্থায় ভেবে দেখুন যদি তাদের বোঝাতে যাই পরমেশ্বরের কথা, তারা কিভাবে বুঝবেন। তখনি হয় গন্ডোগল। সবকিছু গুলিয়ে গিয়ে ভক্তিটাই চলে যায়। তার চেয়ে বরং ধীরে ধীরে এগোনই ভালো। তাদের জন্যে বলি, আমাদের ধর্মেও একটিই ভগবান। তিনিই নানা রূপে নানা সময় নানা কার্য করেন। ঠিক যেমন বিদ্যুৎ। একই স্থান দিয়ে বাড়িতে এসে নানা কাজে লাগে। কখন পাখা, কখন আলো আবার কখন টিভি ইত্যাদিতে। আমাদের শাস্ত্রকারগন আমাদের এযুগের মানুষদের থেকে বহুগুনে উন্নত মস্তিষ্কসম্পন্ন ছিলেন। তাঁদের চিন্তা ও কল্পনা ও ব্যখ্যাশক্তিও ছিল অসাধারন। তাই তাঁরা বিভিন্ন রূপকের মাধ্যমে সমস্ত ধর্মকে ব্যখ্যা করেছিলেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণ মহাত্মা ছিলেন। তিনি তাঁর কথাবার্তার মাঝে ও তত্তকথা বোঝাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নানা উপমা দিতেন? কেন জানেন? কারন একমাত্র এতেই সহজে ধর্মকে বোঝা যায়। আর ঠিক তেমনই সেই যুগের মুনি ঋষিরা নানান উপমার ব্যবহারে ধর্মকথা শাস্ত্রে লিখে গেছেন। কিন্তু এটা মন থেকে মানুন যে তা কিন্তু সবটাই মানুষের উপকারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এইক্ষনে হয়েতো মন থেকে মানতে পারছেন না। আমার গ্রন্থের পরবর্তি অংশগুলি পরতে থাকুন। আপনারাও তা উপলোব্ধি করতে পারবেন। আমার এই ভারত প্রেমের দেশ। এখানে ভালোবাসা সবথেকে ওপরে। তাই হে ভারতবাসী, আজ আমাদের একজোট হয়ে জাগতে হবে। সমস্ত ভন্ডদের মাধ্যমে তাদের লোভ চরিতার্থের কারনে আমাদের এই মহান ধর্মকে আমরা খারাপ হতে, কলুষিত হতে দেবনা। সমস্ত অন্ধ কুসংস্কারকে ধুয়ে ফেলে শুধু ধর্মের মুল সারটুকু তুলে এনে সমগ্র সমাজকে সেই সারের সুধারসে ভাসিয়ে দিতে চাই। তবেই এই সমাজের কল্যান। মানবকল্যানে বোধকরি এর চেয়ে ভালো কাজ আর কিছু হতে পারেনা।
কিন্তু আমরা জানব কিকরে কে ঠিক আর কে ভুল? প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ। ভগবানের সর্বচ্চ সৃষ্টি আমরা। অর্থাৎ মানুষ। ভগবান আমাদের মধ্যে এমন একটি জিনিস দিয়েছেন যার থেকে দামি কিছু বোধহয় কিছু হয়ে না। আর তা হোল মানুষের মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্ককে সঠিক ভাবে কাজে লাগিয়েই আমরা পেতে পারি সত্যের সন্ধান। তবে তার জন্যে চাই সত্যের জ্ঞান, সেই জ্ঞান কিভাবে হতে পারে আসুন সরল ভাবে কিছুটা আলোচনা করা যাক।
আমি পন্ডিত ব্যাক্তি নই। আমি পন্ডিতদের জন্যেও লিখি না। আমি সাধারন, তাই লিখিও সাধারনদের জন্যেই। তাই আমি অনেক সাধারন উদাহরনের মাধ্যম দিয়ে সব ব্যাপার গুলিকে বোঝানোর চেষ্টা করি মাত্র। কিন্তু প্রশ্ন হল সেই উদাহরন যা আমি দি তা যখন কেই পড়ে, তারকাছে তা গ্রহনযোগ্য মনে হয়, হয়েতো বা হয়েনা, কেন এই বিভেদ। বা কখন তা সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য হবে? কখন হবেনা। সেটাই বা জানি কিকরে? এবারে আমি এই সূত্র ধরেই সরাসরি আলোচনার বিষয়বস্তুর কেন্দ্রে প্রবেশ করছি।
ধরাযাক ১০০ জন মানুষকে একসাথে দাঁড় করিয়ে প্রচন্ড গরমের মধ্যে কনকনে ঠান্ডা একটি করে আইসক্রিম হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করা হল এটি ঠান্ডা না গরম? তারা কি উত্তর দেবে বলে আপনার মনে হয়? যদি সকলেই সুস্থ মস্তিকের মানুষ হয় বা মিথ্যা না বলে তাহলে সকলেই আশা করা যায় যে বলবে “ঠান্ডা”। তাইতো? কিন্তু আবার তাদেরই যদি একে একে জিজ্ঞেস করতে শুরু করা হয় যে তাদের প্রত্যেকে পছন্দের রঙ কি কি, তারা দেখবেন হয়েত প্রত্যেকে কখনই একটি রঙই সবার পছন্দ তা বলবেন না। এর কারন কি? এর কারন অনুভুতি। অর্থাৎ অনুভুতির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানকে বলা যেতে পারে “অবিসংবাদী সত্য” (Universal Truth) । তাই মানুষ যে দলেরই হোক না কেন, যে দেশেরই হোক না কেন তাদের কাছে এই অনুভুতির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান সর্বদাই একই হবে। পৃথক হবেনা। তাই সূর্য উঠলে দিন হয় আবার অস্ত গেলে রাত হয় ইত্যাদি সারা দুনিয়ার লোক মানবে। কিন্তু লক্ষ করুন এই ধরনের মানার বা “অবিসংবাদী সত্য” এর সংখ্যা কিন্তু অনেকই কম। আর তার কারন হোল অনুভুতির অভাব। আর এই কারনেই মানুষের নানা ধরনের বিচার বুদ্ধির কারনে মানুষের মধ্যে আজ এত দন্ধ এত মারামারি। কিন্তু প্রকৃতির এই অপুর্ব মায়ায় সৃষ্ট এই বিষয়টিকে কেউই হাত করতে পারবে না যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের একই ধরনের চিন্তা হবে। আর তা উচিতও নয়। কারন তাহলে সৃষ্টিই আর হবেনা। কারন ভাবুন সবাই যদি বলে মিষ্টি ভালোবাসিনা তাহলে মিষ্টির দোকান চলবে কিকরে? সবাই যদি বলে রাস্তার খাবার খাবোনা তবে সেই লোকগুলির পেট চলবে কিকরে যারা রাস্তার ধারে খাবার বিক্রয়ের মাধ্যমে সংসার প্রতিপালন করেন? তবে কি দাঁড়াল? দাঁড়াল এই, যে, আমরা অযথা এইসব বিষয়গুলোতে মানুষের একই অনুভুতি বা একই চিন্তার জাগোরনের কথা বলছিনা। আমি বলছি আধ্যাত্মিক অনুভুতির কথা। সেই চেতনার কথা, যা জাগ্রত হলে সবার কাছেই সেই অনুভূতি একই হবে। সবাই একই কথা বলবে যে ঈশ্বর সুন্দর। এই অনুভুতি অপার তৃপ্তিদায়ক এ বিষয় কারর মনেই কোন সন্দেহ থাকবেনা। তাই আমার উদ্দেশ্য কোনভাবে এই অনুভুতির জাগোরন। আর সেই অনুভুতি একবার জাগলে, একবার মায়ের কৃপা পেলে আর কোন দন্ধ থাকেনা। সকল অন্ধকার কেটে যায়। তখন জ্ঞানালোকে মানুষ শুধু সত্যিটাকেই দেখে। আসুন এবার সেই কাজ কিকোরে সম্ভব একটু ভেবে দেখি।
একজন আমার কাছে বেশকয়েকদিন আগে বেশ কিছু বিষয় তর্ক তুলেছিল। সে নিজেকে আমার কাছে খুব গর্বের সাথে পরিচয় দিয়েছিল “আমি নাস্তিক” বলে। তাতে তার খুব গর্ব একথা বুঝেছিলাম। এখন তার কিছু প্রশ্ন ও আমার কিছু উত্তর দিলাম। আবার স্মরন করাই আমি অতি সাধারন, তাই কোন ভারি ভারি তত্ত কথা তাকে আমি বলতে পারিনি। আমি সহজভাবেই তাকে উত্তর দিয়েছিলাম। একখানি প্রশ্ন ও উত্তর আলোচনার প্রয়োজনে এখানে তুলে ধরছিঃ
প্রথম প্রশ্নঃ আমাদের হিন্দুধর্মে শুরু থেকেই স্ববিরোধিতা। কেউ বলে কালী আসল, কেউ বলে কৃষ্ণ, কেউ বলে শিব। একেকটি পুরানে একএকজনকে বড় ও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। তবে আসল কে? বড় কে?
আমার উত্তরঃ মনে কর একটি পাওয়ার সাপ্লাই ইউনিট আছে যেখান থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়। এখন সেই বিদ্যুৎ তোমার বাড়িতে একটি মেন পয়েন্ট থেকে এসে বাড়িতে পাখা চালাও, আলো জ্বালাও। এবার বল পাখার কারেন্টটা বড়? নাকি আলোরটা? কোনটা আসল?
সে বলেঃ একই যায়গা থেকে আসছে সবকটি একই হবে। আলাদা আলাদা জিনিস যাযা চলছে তাদের ক্ষমতা অনুযাই আলাদা। কিন্তু বিদ্যুৎ একি আসছে।
আমি বলিঃ এই আমাদের ধর্মের আসল কথা। গোড়ার কথা। ঈশ্বর এক। একটাই শক্তি। একটাই উৎস। কিন্তু তার বিভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ। কখন আলো জ্বালাতে চাও তো কখন জল গরম করতে চাও। তেমনি কখনো মা কালী রূপে বা শিব রূপে ধ্বংস করেন, কখনো বা বিষ্ণুরূপে পালন করেন। ব্রম্মারূপে সৃষ্টি করেন। ইত্যাদি। কিন্তু উৎস এক। সেই পরব্রম্ম পরমাত্মা।
সে মেনেছিল এই সহজ উত্তরে তার বোঝার সুবিধা হয়েছে। আগে অনেক যায়গায় সে এর উতর খুঁজেছে, পেয়েওছে, কিন্তু বোধগম্য হয়েনি। ঠিক এই কারনেই আমি এই লেখা শুরু করি। আমার একটি ধারনা আছে। কতটা সঠিক জানিনা। তাও বলি। এই তত্ত কথা দিয়ে যেখানে যে বইতে লেখা থাকে সেই বইগুলি যারা পরেন তারাও জ্ঞানি। কিন্তু যারা কিছুই জানেন না তারা এই বইএর লেখা কি বুঝবেন? মায়ের স্বরূপ বর্ননা করতে গিয়ে যে মহান ভাষার ব্যাবহার দেখি চন্ডী ইত্যাদি গ্রন্থে তা কি এই যুগের সাধারন মানুষের বা সেই মহা জ্ঞানালোকের ছোঁয়া না পাওয়া মানুষের সম্পুর্ন রূপে বোধগম্য হওয়া সম্ভব? আমার ধারনায়, এই যুগে এমন গ্রন্থ রচনা করতে হবে, যা ঘরে ঘরে খেটে খাওয়া তত্তজ্ঞানশূন্য মানুষকেও সরল ভাষায় দেখাতে পারে সেই মহাজ্ঞানের পথের আলো। আমাদের মহান ধর্মের সর্বরস সংগ্রহ করে মূল রসটিকে বের করে এনে, সমস্ত দন্ধকে ছেঁটে ফেলে রচনা করতে হবে এমন এক গ্রন্থ যা পড়লে মানুষের মনে কালী কৃষ্ণের ভেদভাব চলে গিয়ে চারিদিকে দেখবে একটাই আলো আর যে আলোর থেকে একি সাথে একি শরীরে বেড়িয়ে এসে সামনে দাঁড়াবেন কালী ও কৃষ্ণ। তখন এই প্রতিভাত হবে যে এরা পৃথক সত্তা নন। এরা এক। এবং নিজেও এদের থেকে পৃথক নন। নিযেও এঁরই অংশ। এই বৈদান্তিক সত্যকে সরল ভাষায় পৌঁছবার দায়িত্ব আমি পেয়েছি তাঁরই নির্দেশে। তাঁরই আদেশে। সেই মহান পরমেশ্বর এই কাজে আমাকে এগিয়ে নিয়ে যান তাঁর পরম কৃপায় এই কামনা তাঁর শ্রী চরনে। আর কিছু চাই না। এই কার্যের মাধ্যমে সমাজের কল্যান করে এ জীবনকে সার্থক করতে চাই। যাতে তাঁর সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বলতে পারি। “ওগো প্রিয়, আমি তোমার সৃষ্টির মান রেখেছি গো। এস, আমায় তোমার চরণে আশ্রয় দাও”।
Leave a Reply