সূচনা গ্রন্থকার
ভগবানের অশেষ দয়ায় এই মনুষ্যজীবন লাভ করেছি। তাই এই জীবনটিকে শুধু শুধু ব্যর্থ করতে চাইনা। চাই এমন কিছু করে যেতে যাতে ভগবানও তৃপ্তি পান যে তার এই সৃষ্টি ব্যর্থ হয়েনি। ভগবান যেন আমাকে সেই আলো দেখান এবং সেই কার্যে সাহায্য করেন।
শ্রী শ্রী চন্ডী গ্রন্থে রচিত মাতৃ শক্তির তিনটি চরিত্রের বর্ণনা পাই আমরা। কিন্তু বেশিরভাগ সাধারন মানুষকে দেখেছি সংস্কৃত না জানার কারনে বা উৎসাহের অভাবে বা অন্য কোন কারনে এই অতি সুন্দর কাহিনী গুলি হয়েত সম্পুর্ন জানেন না। সন্তানদেরও সেই শিক্ষা থেকে দূরে রেখেছেন অনেকে। কিন্তু যখন আমার মনে হয়ে মাতৃশক্তির এই অমৃততুল্য কাহিনী প্রত্যেকের শোনা ও বোঝা উচিত। কারন মাতৃশক্তিই এই মহাবিশ্বে সর্বচ্চ শক্তি। যাকে সয়ং ত্রিদেবও পূজা করেন। তাই আমি চেষ্টা করেছি চন্ডীকে সরল বাংলায় কাহিণী রুপে অনুবাদ করার যা ছোট বড় সকলের আগ্রহ উৎপন্য করতে পারে। সেই ভেবেই অনেকদিনকার চেষ্টায়, পাঁচ ছয়েটি বিভিন্ন প্রকাশনীর চন্ডী ঘেঁটে আর জাতীয় গ্রন্থাগারে গিয়েও বেশ কিছুদিন পুরাতন এই বিষয়ের একাধিক গ্রন্থ থেকে আমি লিখি এই কাহিনী সরল করে। আশা করি মায়ের ইচ্ছায় এই গ্রন্থ আপনাদের কাছে আদরের হবে। মায়ের নাম ছড়াক দিকে দিকে। আমরা সকলে মায়ের নাম করতে করতে যেন নিজেকে তাঁর চরনে সোঁপে দিতে পারি। সকলে ভালো থাকুন, অপরকে ভালো রাখুন। ধন্যবাদ। জয় মা।
।। প্রথম চরিত্রঃ মধূকৈটভ বধকারিনী দেবী যোগমায়া। মহাকালী ।।
প্রলয়কালান্তে জগত মহাসলিলে নিমগ্ন ছিল। সেই সলিল মধ্যে ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণু শেষনাগের উপর যোগনিদ্রায় শায়িত। সেই সময় তাঁর কর্নমল থেকে উৎপন্ন হয় দুই ভয়ঙ্কর অসুর। মধূ ও কৈটভ। আর নারায়নের নাভিস্থল থেকে উৎপন্ন পদ্ম থেকে জন্ম নিলেন ব্রহ্মা। দুই অসুর ব্রহ্মাকে দেখা মাত্রই তাঁকে বিনাশে উদ্ধত হল। প্রজাপতি ব্রহ্মা তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে ভগবান বিষ্ণুকে জাগ্রত করার চেষ্টা করলেও তিনি জাগলেননা দেখে তিনি বুঝলেন মা আদ্যাশক্তি যোগমায়া যোগনিদ্রারূপে হরির নেত্রে নিবাসিতা। তাই তিনি জাগ্রত হচ্ছেন না। তখন ব্রহ্মা সেই হরিনেত্রনিবাসিনী যোগমায়াকে সন্তুষ্ট করবার উদ্দ্যেশে স্তব শুরু করলেন – “ত্বং স্বাহা………”
এই স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে যোগনিদ্রাদেবী ভগবান বিষ্ণুর চোখ, মুখ, নাক, বাহু, হৃদয় ও বক্ষস্থল থেকে নির্গত হয়ে ব্রহ্মার দৃষ্টিতে এলেন। ভগবান জনার্দন অনন্তশয্যা ত্যাগ করে দেখলেন দুই অসুর ব্রহ্মাকে ভক্ষন করতে উদ্যত। তখন তিনি সেই অসুরদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। বহু বহু কাল এই মহাযুদ্ধ চলার পর যখন কেউই হারলেননা তখন মধু কৈটভ নিজেদের বিরত্ব প্রকাশের উদ্দ্যেশে বিষ্ণুকে বললেন – “আমরা তোমার বিরত্বে সন্তুষ্ট। তুমি আমাদের কাছে বর প্রার্থনা কর”। বিষ্ণু ঈষৎ হাস্যে বললেন “বেশ, তবে এই বর দাও যে তোমরা আমার হাতে বদ্ধ হবে।” বুদ্ধিসল্পতায় এভাবে নিজেদেরই বিনাশের পথ প্রশস্থ হতে দেখেও তারা নিজেদের দেওয়া বর থেকে সরে এলো না। তবুও শেষ রক্ষার আশায় যখন তারা দেখল চারিদিক জলমগ্ন, তারা বলল, “একমাত্র যেখানে শুষ্কস্থল আছে, সেইরূপ স্থানে আমরা বধ্য হব।” বিষ্ণু সেই ব্যবস্থাও করলেন। বিশাল মুর্তি ধারন করত আপন উরুর উপরিস্থলে দৈত্যদ্বয়কে স্থাপন পূর্বক চক্র দ্বারা তাদের মস্তক ছেদন করলেন। এইভাবে প্রথম চরিত্রে দেবী আদ্যাশক্তি ব্রহ্মার দ্বারা স্তুতা হয়ে আবির্ভূতা হয়েছিলেন।
ইতি শ্রী দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য কৃত নমশ্চন্ডিকায়ৈ নামক দেবীমাহাত্য বর্ননকারী ও দেবীস্তুতিমূলক গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত।
।। মধ্যম চরিত্রঃ মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গা। মহালক্ষী ।।
পূর্বকালে একশত বৎসর ব্যাপি ভয়ানক যুদ্ধের পর অসুরদের কাছে দেবতারা পরাজিত হলে স্বর্গের অধিপতি হয়ে সিংহাসনে আরহন করলেন মহিষাসুর। দেবগন তখন ব্রহ্মাকে প্রধান করে বিষ্ণু ও মহেশ্বরের নিকট নিজেদের এই সর্বনাশের কথা এবং ত্রিভুবনে দেবলোক ও মনুষ্যলোকের ওপর মহিষাসুরের অকথ্য অত্যাচারের নিদারূন কাহিনী প্রকাশ করলে ত্রিদেবের অত্যন্ত ক্রোধ উৎপন্ন হলে সেই ক্রোধ তাঁদের নেত্র দিয়ে অগ্নিরূপে নির্গত হইয়ে সেই একিভুত তেজ দশদিকে পরিব্যপ্ত হোল। সকলে দেখলেন সেই পর্বতপ্রমান তেজপুঞ্জ হতে অতি অপরূপা এক স্ত্রীমুর্তি বেড়িয়ে আসছেন। ইনিই আদ্যাশক্তি দুর্গারূপে আবির্ভুতা হলেন। দেবগন অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে দেবীকে নানা অলঙ্কার ও অস্ত্রশস্ত্রে ভুষিত করলেন। দেবী রণরঙ্গিণী মুর্তিতে হিমালয়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত সিংহরাজের উপর নিজস্থান গ্রহন পূর্বক সিংহবাহিনী রূপে অট্টহাস্য করতে লাগলেন। সেই অট্টহাস্যে ত্রিভুবন কেঁপে উঠল। পৃথিবী ও পর্বতসকল দুলতে লাগল। দেবগন ও মুনিগন দেবীর স্তুতিতে মুখরিত হলেন। তখন মহিষাসুর অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল “আঃ, এসব কি”? বিষয় সম্পর্কে অবগত হতে দেবীর দিকে অগ্রসর হয়ে দেখল দেবীর মুকুট আকাশ ছাড়িয়েছে। তাঁর সহস্র বাহুতে দশদিক আচ্ছাদিত। অখন মহিষাসুর তার সেনাপতি চিক্ষুর কে প্রেরণ করল। এবং সেই সঙ্গে শুরু হল মহাযুদ্ধ। উদগ্র, মহাহনু, অসিলোমা, বিড়াল নামক ভয়ানক নানা অসুর এবং তৎসহ শত সহস্র অসুরবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল মহাদেবীর বিরূদ্ধে। মায়ের বাহন সিংহরাজ ভয়ঙ্কর দাবানলের ন্যায় সমগ্র রণক্ষেত্রে অসুর নিধনে লিপ্ত হল। মায়ের নিশ্বাস থেকে উৎপন্ন হতে লাগল শত সহস্র দেবী সৈন্য। তাঁরা বিবিধ অস্ত্রে সমগ্র অসুরবাহিনীকে বধ করতে লাগলেন। রনক্ষেত্র শ্বশানপুরিতে পরিনত হতে লাগল। অসুরদের এই অবস্থায় চিক্ষুর এবার দেবীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে শূল নিক্ষেপ করলে দেবী আপন শূলে তা প্রতিহত করলেন। চিক্ষুরের পতন হলে চামর যুদ্ধে নিযুক্ত হয়ে শূল নিক্ষেপ করলে দেবী আপন শূলে তাও প্রতিহত করলেন। আর তখন সিংহরাজ আকাশে লাফিয়ে উঠে সবেগে চামরের উপর ঝাঁপিয়ে পরে তার মাথা দ্বিখন্ডিত করে দিল। দেবী এরপর একে একে শিলা বৃক্ষের দ্বারা উদগ্রাসুরকে, দন্ডমুষ্ঠি ও চপেটাঘাতে করালাসুরকে, গদাঘাতে উদ্ধতাসুরকে, ভিন্ডিপালের দ্বারা বাস্কলাসুর ও বানের দ্বারা তাম্রাসুর ও অন্ধকাসুরকে বিনাশ করলেন। ত্রিশূলের দ্বারা উগ্রাস্য, উগ্রবীর্য ও মহাহনু অসুর ও তলোয়ার দ্বারা বিরালাসুরের মস্তক ছেদন করে দুর্দ্ধর ও দুর্ম্মুখ নামক অসুর দ্বয়কে বানদ্বারা বধ করলেন। এইভাবে সমগ্র অসুরকুল বিনাশ হতে দেখে মহিষাসুর মহিষের রূপ ধারন পূর্বক যুদ্ধে নামল। এবং সিংহকে বধ করতে অগ্রসর হলে দেবী ভয়ানক ক্রদ্ধ হয়ে পাশদ্বারা মহিষকে বেঁধে ফেললেন। তখন মহিষরূপ ত্যাগ করে সিংহরূপ ধারন করলে দেবী খড়গদ্বারা তার মুন্ডচ্ছেদ করলেন। তখন আবার খড়গধারী পুরুষরূপ ধারন করলে দেবী বানদ্বারা সেই পুরুষকে বিনাশ করলেন। তখন মহিষাসুর হাতীর রূপ ধরে সিংহবাহনকে শুঁড়ে আকর্ষন করলে দেবী খড়গদ্বারা শুঁড় ছিন্ন করলেন। পুনর্বার মহিষরূপ ধারন করে ক্ষুর দ্বারা ভূমি বিদীর্ণ করল। সমগ্র ত্রিভুবন এই প্রচন্ড যুদ্ধে দ্যোদুল্যমান। মহিষের লেজের আঘাতে সমুদ্র উদ্বেলিত। মহিষাসুর শিং দ্বারা বড় বড় পর্বত দেবীর দিকে নিক্ষেপ করতে লাগল। দেবী এ যাবত এতসব ঔদ্ধত্যে ক্রুদ্ধ হয়ে পুনঃ পুনঃ মধূপান করতে করতে বললেন – “ওরে মূঢ়, আমি যতক্ষন মধূপান করছি ততক্ষন তুই গর্জন কর। তারপর আমার হাতে তোর মৃত্যু হলে দেবতারা আনন্দে কোলাহল করবেন”। তারপরেই এল সেই চরম মুহুর্ত। দেবী মহিষাসুরের উপর চড়ে বসলেন এবং পদতলে চেপে ধরে শূলদ্বারা তার কন্ঠে আঘাত করলেন। মহিষাসুর পুনরায় অন্যরূপ ধারন করতে গেলেও দেবীর প্রচন্ড তেজে তা অর্ধসম্পূর্ন হলে দেবী খড়গদ্বারা তার মস্তক ছিন্ন করলেন। মহিষাসুর মর্দন সম্পুর্ন হল। চারিদিকে চরম প্রশান্তি নেমে এলো। দেবগন, ঋষিগন, গন্ধর্বগন একত্রিত হয়ে দেবীর স্তুতি করতে লাগলেন।
ইতি শ্রী দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য কৃত নমশ্চন্ডিকায়ৈ নামক দেবীমাহাত্য বর্ননকারী ও দেবীস্তুতিমূলক গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত।
।। উত্তম চরিত্রঃ ধুম্রলোচন, চন্ডমুন্ড, রক্তবীজ, শুম্ভ নিশুম্ভ বধ কারিণী দেবী আদ্যাশক্তি, মহাসরস্বতী ।।
পুরাকালে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক অসুর ভাতৃদ্বয় দেবতাগনকে পরাজিত করে ইন্দ্র, সূর্য, চন্দ্র, বরুন, কুবের আদি দেবগনের সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে ত্রিলোকের অধিপতি হয়েছিল। এই অবস্থায় দেবগন স্মরন করলেন মহিষাসুর বধের পর দেবী দেবগনকে এই বলে আশীর্বাদ করেছিলেন যে যখনই কেউ কোথাও কোন প্রকারের বিপদে পড়বেন, দেবী তাদের রক্ষা করবেন। এই কথা স্মরনে এলে দেবগন মা আদ্যাশক্তির স্তুতি শুরু করলেন তাকে প্রসন্ন করে এই বিষয় সবিশেষ জানাতে। দেবী পার্বতী সেই সময় সেই স্থান দিয়ে গঙ্গা স্নানে যাচ্ছিলেন। দেবগনের এই স্তুতি শুনে জিজ্ঞাসা করলেন যে তাঁরা কার স্তুতি করছেন। দেবগনের উত্তরের পূর্বেই দেবী পার্বতীর শরীর কোষ থেকে শিবাদেবী আবির্ভুতা হয়ে বললেন – “শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক অসুরের দ্বারা বিতাড়িত দেবগন সর্বস্ব পুনরুদ্ধারের কামনায় আমারই স্তব করছেন”। পার্বতীর দেহকোষ থেকে আবির্ভুতা হওয়ায় এই দেবী কৌষিকী নামে খ্যাতা হলেন। দেবী কৌষিকী সিংহবাহনে চড়ে হিমালয় পর্বত আলোকিত করে বিরাজিতা হলেন। চন্ড ও মুন্ড নামে শুম্ভ নিশুম্ভের দুই সেনাপতি ভৃত্য সেই স্থলে বিচরনকালে দেবীর এই অপরূপ রূপ দেখে তৎক্ষণাৎ তাদের প্রভুর কাছে গিয়ে নিবেদন করল – “মহারাজ, আপনারা যেখানে ত্রিলোকের সর্বসুন্দর বস্তু লাভ করেছেন, তখন ত্রিলোকের সবচেয়ে সুন্দর নারীকে আপনাদের মধ্যে একজনের মহারানী রূপে গ্রহন করুন”। এ প্রস্তাবে খুশি হয়ে শুম্ভ সুগ্রীব নামক এক দূতকে সেই প্রস্তাব দেবীর কাছে উপস্থাপনের নিমিত্ত প্রেরন করল। দূতের মুখে এই প্রস্তাববানী শুনে ছলনাময়ী দেবী ঈষৎ হাস্যে বললেন-“এ তো অতি উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু আমার যে এক প্রতিজ্ঞা আছে। যে পুরুষ যুদ্ধে আমাকে পরাজিত করতে পারবেন তাকেই আমি পতি রূপে গ্রহন করতে পারব”। এ কথা জ্ঞাত হয়ে শুম্ভ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে হুঙ্কারে বলল – “এত স্পর্ধা নারীর, এত গর্ব?” এরপর ক্রোধভরে শুম্ভ তার সেনাপতি ধুম্রলোচনকে আদেশ দিল সেই নারীকে তার সম্মুখে নিয়ে আসতে। এমনকি কথায় না এলে কেশাকর্ষন পূর্বক নিয়ে আসারও আদেশ দিল। ধুম্রলোচন ষাট হাজার সৈন্য নিয়ে দেবীর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে সে কথা জানাল এবং সাবধান বানী শুনিয়ে শুম্ভের আদেশের কথা জানাতেই দেবী বললেন – “তবে আমাকে বলপূর্বক নিয়ে যাও”। ধুম্রলোচন উদ্যত হতেই দেবী ভয়ঙ্কর হুঙ্কার ছাড়লেন। প্রচন্ড শব্দ ও সেইসঙ্গে দেবীর মুখ থেকে নির্গত হল ভয়ঙ্কর অগ্নি। সেই শব্দ ও আগুনে নিমেষের মধ্যেই ভস্মিভুত হয়েগেল ধুম্রলোচন।
এ সংবাদে ক্রোধিত শুম্ভ নিশুম্ভ তখন দুই সেনাপতি চন্ড ও মুন্ডকে প্রেরন করল দেবীর বিরুদ্ধে। শত সহস্র অসুর সেনা, চতুরঙ্গ নিয়ে চন্ডমুন্ড উপস্থিত হল দেবীর সম্মুখে। দেবী তাদের দর্শন মাত্র প্রচন্ড ক্রোধিত হলেন। তাঁর মুখমন্ডল কৃষ্ণবর্ন ধারন করল আর তখনই দেবীর তৃতীয় নয়ন থেকে বেড়িয়ে এলেন মা কালী। হাতে তাঁর তীক্ষ্ণ খড়গ, গলায় নরমুন্ডমালা, ভয়ঙ্করী, বিশালবদনা, লোলজিহ্বা, ভীষনা মা কালী অসুরগনের ওপর ঝাঁপিয়ে পরে খড়গাঘাতে সহস্র অসুরের মস্তক ছিন্ন করতে শুরু করলেন। সৈন্যদের নিজ মুখে নিক্ষেপ করে ভক্ষন করতে লাগলেন ভয়ঙ্কর দেবী। অসুরদের নিক্ষিপ্ত বান, ভীষন অস্ত্রশস্ত্র গিলে ফেলে ভয়ঙ্কর অট্টহাস্য করতে লাগলেন। অসুরকুল ভয় কেঁপে উঠল। এরপর তিনি চন্ডের দিকে ধাবিত হয়ে তার চুলের মুঠি ধরে বিশাল খড়গাঘাতে তার মুন্ডচ্ছেদন করলেন। মুন্ডকেও বধ করলেন দেবী কালিকা। চন্ডমুন্ড বধ হল। সেই দুই মুন্ড তখন দেবী কালী নিয়ে এলেন মা চন্ডিকার কাছে। চন্ডিকা খুশি হয়ে বললেন – “চন্ড মুন্ডকে বধ করে তুমি ত্রিভুবনে চামুন্ডা রূপে অভিহিতা হবে”। জয় হে মা চামুন্ডে, জয় মা কালী।
চন্ডমুন্ড বধ হয়েছে এই সংবাদে ক্রোধভরে শুম্ভ তার সমস্ত সৈন্যদলকে নতুন করে যুদ্ধ সজ্জা করতে আদেশ দিল। তখন হাজার হাজার সৈন্য সুসজ্জিত করে দেবী চন্ডিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ অভিযান করল। দৈত্যসৈন্যগন চারিদিকদিয়ে দেবীকে ও বাহন সিংহরাজকে ঘিরে ফেলল। তখন ব্রহ্মা, শিব, বিষ্ণু, কার্তিকেয়, ইন্দ্রাদি দেবতাগনের আপন আপন শক্তি সকল তাঁদের দেহ থেকে বেড়িয়ে নিজ নিজ শক্তি রূপে দেবী চন্ডিকার চারিদিকে নেমে এলেন। ব্রহ্মাণী, বৈষ্ণবী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বারাহী, নারসিংহী, ঐন্দ্রী আদি দেবীগণ সমগ্র রনক্ষেত্রের চারিদিকে প্রকাশিতা হলেন। তখন মহাদেব সেই সমস্ত দেবীশক্তিদের সাথে চন্ডিকার সম্মুখে এলেন এবং বললেন – “হে দেবী, আমার প্রীতির জন্য তুমি অসুরদের বিনাশ কর”। তখন চন্ডিকা শিবকে বললেন – “হে দেব, দৈত্যদের বলুন এইক্ষনে পাতালে চলে যেতে, আর দেবতাদের সর্বস্ব ফিরিয়ে দিতে, নতুবা আমার যোগিনীরা তাদের এইক্ষনে ভক্ষন করবেন”। দূতীর দূত রূপে শিব ক্রিয়া করায় দেবী চন্ডিকার আরেক নাম ‘শিবদূতী’ হয়। শিব তখন এই সংবাদ অসুরদের জানাতেই তারা প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হয়ে দেবীকে আক্রমন করল। তখন দেবীর সেই সকল শত শত শক্তিরূপিনী দেবীগণ আপন আপন মন্ত্র ও অস্ত্র দ্বারা শত সহস্র অসুর বিনাশ করতে লাগলেন। তখন এক মহাসুর রক্তবীজ যুদ্ধে এগিয়ে এল। এই ভয়ঙ্কর অসুরের বিশেষত্ব, যেখানে এর যত ফোঁটা রক্ত পড়বে সেই স্থল থেকে সম সংখ্যক রক্তবীজ জন্মাবে। এইভাবে যুদ্ধে তার রক্ত ফোঁটা থেকে শত সহস্র রক্তবীজ জন্মাতে লাগলো। সেই রক্তবীজের দল চারিদিক ছেয়ে ফেলেছে দেখে দেবতারা শঙ্কিত হলেন। তখন দেবী চন্ডী সহাস্যে মা কালীকে বললেন – “হে চামুন্ডে, তুমি আপন মুখ সুবিস্তৃত কর আমার অস্ত্রাঘাতে রক্তবীজের যে রক্ত নিঃসৃত হবে তা তুমি পান কর, তবেই এর শেষ হবে”। এই নির্দেশে মা কালী ভয়ঙ্করী রূপে মুখ ব্যাদান পূর্বক রক্তবীজের রক্ত পান শুরু করলেন। দেবীর অস্ত্রাঘাতে এবং চামুন্ডের এই ক্রিয়ায় রক্তবীজ রক্তশুন্য হয়ে পতিত হল। মাতৃশক্তি রক্তবীজ বধ করলেন।
ভয়ানক শক্তিশালী অসুর রক্তবীজের সমাপ্তি ঘটলে শুম্ভ নিশুম্ভ আর ধৈর্য্য ধরতে না পেরে ক্রোধাগ্নিতে জ্বলতে জ্বলতে সম্মুখ সমরে উত্তীর্ণ হল। তারা শতসহস্র বানে আকাশ ছেয়ে ফেললে দেবী শুলের দ্বারা তা ছিন্নভিন্ন করতে লাগলেন। শুম্ভ শুল নিক্ষেপ করলে দেবী মুষ্টি দ্বারাই সেই শুল দ্বিখন্ডিত করলেন। এরপর দেবী নিশুম্ভকে বান দ্বারা ধরাশায়ী করলে শুম্ভ ভ্রাতার এই অবস্থায় আরো ক্রুদ্ধ হয়ে দশহাজার বাহু বিস্তার করে দেবীকে আচ্ছন্ন করল। তখন নিশুম্ভ সংজ্ঞা প্রাপ্ত হয়ে গদা দিয়ে দেবীকে আক্রমণ করলে দেবী শুল দ্বারা নিশুম্ভের বক্ষ বিদীর্ন করে দিলেন। নিশুম্ভের বিদীর্ন বক্ষস্থল থেকে আরেক অসুর জন্ম নিতে গেলে দেবী খড়গের দ্বারা তার মুন্ড ছেদন করলেন। নিশুম্ভ বধ সম্পূর্ণ হল। এদিকে অন্যান্য দেবীগন শতসহস্র অসুরদের বিনাশ করে চারিদিকে অসুরনিধন যজ্ঞ করছেন। ভ্রাতার মৃত্যতে শুম্ভ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। ক্রুদ্ধ শুম্ভ হুঙ্কার ছেড়ে দেবীকে বলল – “রে গর্বিতা, তুমি বলদর্পে অহঙ্কার করনা, তুমি অন্যসব দেবীদের সহায়তায় লড়াই করছ। আপন ক্ষমতা থাকলে একাকী যুদ্ধ কর”। এই কথা শ্রবণে দেবীর অট্টহাস্যে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মান্ড প্রকম্পিত হল। সহাস্যে দেবী বললেন – “ওরে মূর্খ, দেয়ে দেখ, বাকী দেবীরা কেউই আমার থেকে পৃথক নন। এঁরা সকলেই আমি। আমিই বহুরূপে বহু শক্তিতে বিশ্বচরাচরে পরিব্যাপ্তা। দেখ”। বলতে বলতেই শুম্ভ দেখল সমস্ত দেবীগণ অট্টহাস্য করতে করতে দেবী চন্ডিকার মধ্যে মিশে যাচ্ছেন। সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্রে তখন শুধু একজনই দেবী শক্তি, মা চন্ডী। দেবী আবার দম্ভ সহ বললেন – “আমার ঐশ্বর্য শক্তির প্রভাবে আমি বহুরূপে অবস্থান করছিলাম, এখন আমি একাকী রণক্ষেত্রে অবস্থিতা, যুদ্ধ করতে আর আপন মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত হ রে মূর্খ অসুর”। তারপর ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হল। বান, শূল, গদা, শক্তি আদি অস্ত্রের সংঘাতে ত্রিলোক আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। মাটিতে, মহাশূন্যে ঘোর যুদ্ধের পর দেবী প্রচন্ড শুল দ্বারা শুম্ভের বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। সাগর পর্বত সহ সমগ্র পৃথিবী দুলে উঠল। শুম্ভ ভূপতিত হল ও মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ল। শুম্ভ বধ সমাপ্ত হল।
সারা বিশ্বে চারিদিকে প্রসন্নতা এবং প্রশান্তি নেমে এল। দেবগন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সমগ্র বিশ্ব মুক্ত ও শান্তির আশ্রয়স্থল লাভ করল। মা চন্ডীর কৃপায় সমগ্র বিশ্বব্রম্মান্ড অশুভ শক্তির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে শুভ শক্তিতে জেগে উঠলো। অশুভ শক্তির বিনাশ হল। অন্ধকার কেটে গিয়ে শুধুই প্রশান্তি দিগ্বিদিকে পরিব্যাপ্ত হল। সকলে দেবী চন্ডিকার জয়ধ্বনী করতে লাগলেন।। শঙ্খধ্বনী, উলুধ্বনী ও জয়ধ্বনীতে মুখরিত হয়ে উঠল বিশ্বচরাচর। পরম শান্তি লাভ করে সকলে রত হল দেবীর জয়গানে ও আরাধনায়। দেবগন মিলিতভাবে দেবীর স্তুতি বন্দনায় রত হলেন।
তুমি সর্বলোকে, সর্বকালে বিরাজিতা। তুমি সর্বজীবের প্রাণ সঞ্চারিনী আদিশক্তি। তুমি নিরাকারা, তবুও তুমি সাকারা। তোমার ব্যাপ্তি সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে। তোমার আকারের বর্ননা করবে এ সাধ্য কার আছে? তুমি ইচ্ছাময়ী, নিজ ইচ্ছায় প্রকাশিতা। তুমি মায়াময়ী, সৃষ্টি জুড়ে তুমি মায়ার জালে আবদ্ধ রেখেছো জীবকুলকে। তাই তুমি মহামায়া। এই মায়াজাল ছিন্ন হলে তবেই তোমায় জানা যায়। তাও সম্ভব শুধু তোমারই দয়ায় মাগো। তাই তো তুমি দয়াময়ী। তোমার স্মরণে এলে, তোমায় ভক্তিভরে মন প্রাণ দিয়ে ডাকলে তুমি সাড়া দেবে না একি কখনো হতে পারে মা? সন্তানের ডাকে মা কি পারে সাড়া না দিতে? ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় যখন শিশু মা মা করে কাঁদে তখন তার মা কি ছুটে না এসে থাকতে পারে মা গো? তেমনি আমরাও তোমায় ডাকছি মা। আর এ ক্ষুধা একমাত্র তোমায় প্রাপ্ত হওয়ার ক্ষুধা। এ কান্না, তোমার স্বরূপ জানতে পারার আনন্দ ও শান্তির। কারন তোমায় একবার জানা হলে পার্থিব দুঃখের আর সম্ভাবনা থাকেনা। তখন শুধুই শান্তি, শান্তি আর পরম শান্তি। জয় মা চন্ডিকা, জয় মা দুর্গা, জয় মা কালী, জয় মা আদ্যাশক্তি মহামায়া, জয় মা, জয় মা, জয় মা।।
ইতি শ্রী দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য কৃত নমশ্চন্ডিকায়ৈ নামক দেবীমাহাত্ম বর্ননকারী ও দেবীস্তুতিমূলক গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত।
ইতি শ্রী দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য কৃত নমশ্চন্ডিকায়ৈ নামক দেবীমাহাত্ম বর্ননকারী ও দেবীস্তুতিমূলক গ্রন্থ সম্পূর্ন হল।
Leave a Reply