সুশীলের শাস্তি

    সুশীলের শাস্তি

    প্রথম পরিচ্ছেদ-সুশীল

‘নন্দিপুর বিদ্যামন্দির’।নন্দিপুর গ্রামের একমাত্র বড় লাল রঙের দোতালা বদ্যালয়।সেই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে একটি ছেলে,নাম সুশীল।বয়স ১৫ বছর।খুব সাংঘাতিক দুরন্ত ছেলে সে।স্কুল শুদ্ধ সবাই তাকে এক ডাকে চেনে।যেদিন ইচ্ছা হয় সেদিন সে স্কুলে যায়,সেই রকমি স্কুল তাই ওকে এখনও রেখেছে।তার অসভ্যতার প্রমাণ আছে অনেক।যেমন-ক্লাসে স্যার ঢুকলে উঠে দাঁড়ায় না।সব সময়ই তার চিন্তা কখন কার কোন জিনিসটা লোপাট করা যায়।ভাল ছেলেরা তার থেকে একটু দূরে দূরে থাকতো।তার সঙ্গে কথা বলতো না।তবে পিছনের বেঞ্চের সব বাজে ছেলেদের সাথে তার খুব ভাব।সুশীলরা ভাল বাড়িতেই থাকে।তবুও তার আচার বপব্যহার গরীবদের মতন।মাঠে মাঠে ঘুঘু মেরে কাঠবিড়ালি ধরে বেড়ানো তার কাজ।পড়াশুনার কথা তো অনেক দূর।যেমন একদিন স্যার ক্লাসে এসেছে,ঢুকেই সুশীলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো”কি রে আজ পড়াশুনা করেছিস?”সুশীল মুখ কাচুমাচু করে বললো”না মানে ইয়ে,একটু দাদার বিয়েতে গেস্লুম কিনা,তাই ঠিক পড়াটা হয়ে ওঠেনি।”স্যার তাকে চেনেন।তাই কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না।
এখন মনে হতে পারে,তার কি কন মাস্টার ফাস্টার চিল না?হ্যাঁ ছিল।তবে সুশীলের কাছে কেউই টিকতে পারতো না।এক মাস্টারের মাথায় একটু ছিট ছিল।কিন্তু দ্বিতীয় মাস্টার ভালই ছিল।তবে তার মাথায় ছিট করিয়ে দিয়ে সুশীল তাড়িয়ে ছিল তাকে।সেই দুটো ঘটনার কথাই এখন বলছি।

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ-প্রথম মাস্টার

সুশিল সারাদিন প্রায় বলতে গেলে বাড়ীতেই থাকে না।সে আসে একবার দুপুর বারোটায়,তা আসে স্নান করতে ও খেতে,তারপরই মার কাট।বাবা মা কত করে ডাকেন ‘ওরে যাসনেরে,ওরে যাসনেরে’।কে শোনে কার কথা।সে তখন চিত্তর জিলিপি খেতে রওনা দিয়েছে।আর স্কুলেও সে দুসপ্তাহে একদিন যায়।মা বাবা মিলে অনেক পরামর্শের পর একদিন তার বাবা একজন বেশ জাদরেল মাস্টার ধরে নিয়ে এল।তার সঙ্গে সুশীলের সমস্ত কথা ঠথা বলে তাকে একেবারে ঠিক করে ফেলল।সে কি পড়াবে,কত মাইন নেবে,কখন আসবে এইসব।সুশীলের সব দুরন্ত পনার কথাও তাকে সব জানিয়ে দিল।
সন্ধ্যাবেলা সুশিল প্রতিদিন আসে বাড়ীতে মুড়ি খেতে।সারাদিন সে তার পাড়ার বন্ধু কিশোরের সাথে খেলে বেড়ায়,অপকর্ম করে বেড়ায়।বাবা মা তাকে কিছুতেই আটকাতে পারে না।সে আবার আলাদা ঘটনা,এখন যা বলছি সেটাই বলি।সেদিনও সে যথারীতি সন্ধ্যা সময় বাড়ী ফেরে এসেছে।ঘরে ঢুকে তার মাকে হাঁক দিল”মা মুড়িটা দিয়ে……”।এইটুকু বলেই তার কথা আটকে গেল।খাটের ওপর বসে আছে তার সেই জাঁদরেল,টেকো মাথা মাস্টার।কিন্তু সুশীল তো আর জানে না যে,এতদিন পর তার জন্য মাস্টার ঠিক করা হবে।সে ভাবলো এ মনেহয় বাবার কোন বন্ধু।তাই সে মাস্টাররকে বললো “আপনি বাবার বন্ধু তো?ঠিক আছে আমি বাবাকে ডেকে দিচ্ছি।”মাস্টার বললো গম্ভীর ভাবে(এমনিতেই তার গলার স্বর বিশাল গম্ভীর)তার দরকার নেই।আমি তোমার জন্যেই বসেছিলাম।’অ্যা’।’অ্যা নয় হ্যাঁ’।তোমার বাবা আমাকে রেখেছেন তোমাকে সংস্কৃত পড়াতে।যাও বই নিয়ে এসো।সুশীল তিনবার ঢোক গিলে আস্তে আস্তে বললো’সং-স-কি-রি-ত’।আমি আবার এখন পড়তে বসবো নাকি?কোন্দিন তো এইসময় পড়তে বসিনি।সেই জন্যেই তো এই অবস্থা।দুবার গাড্ডু খেয়েছো।এখন তুমি আমার হাতে পড়েছো।একন আর কোন কথা নয়।

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ-পড়া শুরু হল শেষে

সুশীল আর কি করে।বি আনতে পাশের ঘরে গেল।পাছে আবার ঘ্যান্ ঘ্যান্ করে তাই তার মা আগে থেকেই বাইরে চিলে গেসলো।ভারি ভারি পাথর তোলার মতন সংস্কৃত বইটা ও খাতাটা তুলে নিল সে।এঘরে এসে তো সে একেবারে অবাক।খাটের ওপর তার সেই নতুন মাস্টার,বাবু অয়ে তপস্যা করার মতন করে বসে সামনে একটা ক বই নিয়ে আস্তে আস্তে পড়ছে-
“কুতস্ত্বা কল্পমামিদং বিষমে সমুপস্থিতম্।
অনার্য্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্তিকরমর্জন।”
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন-হে অর্জুন।এমন সময় সুশীল বললো-‘স্যার’।মাস্টার আস্তে আস্তে চোখ খুলে বললো-“এসো বৎস আসন গ্রহণ করো”।সুশীল প্রচন্ড রকম চমকে উঠলো।সে ভাবল মাস্টার এতক্ষণ খাঁটি মাস্টারের মতন কথা কইছিল।এখন তো মনে হচ্ছে বাল্মীকি ঠাল্মিকিরভূত এর ওপর ভড় করেছে,কি পড়ছিল ওটা?ওটা পড়েই মনে হচ্ছে এই ভূতটার উৎপত্তি হল।সুশীল জিজ্ঞাসা করলো-“স্যার,আপনি ওটা কি পড়ছিলেন।শ্রীমদ্ভাগবত গীতা বৎস”বলে তিনি গীতাটি বন্ধ করে হাত জোড় করে তিনবার চোখ বুজে নমস্কার করে বললেন’বলো শ্রীকৃষ্ণে্র জয়’।সুশীল ভাবলো আচ্ছা মাস্টারের পাল্লায় পড়েছিতো।মরতে এখন শ্রীকৃষ্ণের জয় বলতে যাব কেন?অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে বললো শ্রীকৃষ্ণের জয়।মাস্টার এবার বললো ঠিক আছে।এবার তোমার পাঠ আরম্ভ হইবে।বলতো-আত্মপৌম্যেন মানে কি?সুশীল এবার ভাবলো এ আবার কোন দেশের মাস্টারের বাবা।ফট করে এসব কি বকতে বসলো।সে বললো স্যার আপনি তো কিছু বোঝালেনি না।এখন বলছেন এর মানে কি?এখন আমি কি করে এর মানে বলবো?ঠিক আছে,ঠিক আছে।”তোমাকে এর অর্থ আমি কল্য বোঝাইবো……”।আবার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন,এমন সময় সুশীলের বাবা হুট করে ঘরে ঢুকে পড়লেন।মাস্টারের দিলে গট্ গট্ করে এগিয়ে গেলেন।তারপর ভ্রু কুচকে বললেন-ছিঃ ছিঃ।আপনি মাস্টার?অ্যাঁ?প্রথম থেকেই একটা ছেলেকে কিছু না শিখিয়ে,কিছু না বুঝিয়ে আপনি উল্টো পালটা প্রশ্ন শুরু করলেন।এর উত্তর ও কি করে দেবে তা ভেবে দেখছেন না।প্রথমে এসেই তো গীতা নিয়ে পড়লেন।আমি আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসে সব দেখেছি।এখন আপনি আসতে পারেন।এই কথা শুনে মাস্টার প্রচন্ড ক্ষেপে গেলে গীতাটাকে তুলে নিয়ে সে বললো(গীতাকেই উদ্দেশ্য করে বললেন)’চলুন ভগবান’।এখানে আরেক মুহূর্ত নয়।এরা আর আপনার মাহাত্ম্য কি বুঝবে।এরা এখনো নাবালক।এইসব বলে গজ্ গজ্ করতে করতে সে হুট করে বেড়িয়ে গেল রাস্তায়।সুশীলের বাবা মনে মনে বললো”যত পাগল জুটেছে আমার বড়াতে।”তারপর সুশীলের দিকে তাকিয়ে বললো”একটা মাস্টার চলে গেল বলে মনে করিসনা আবার নেচে নেচে বেড়াবি।আবার আমি নতুন মাস্টার ঠিক করবো।এতা মনে রাখিস।”বলে অন্য ঘরে চলে গেল।সুশীল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

পরেরদিন থেকে সুশীলের আবার ভাল্ভাবেই দিঙ্গুলো যেতে লাগলো।সকাল আটটা বাজলেই চলে গেল কিশোরের বাড়ী।ওকে ডেকে নিয়ে ওদের যা কাজ তাই করে বেড়াতে লাগলো।পারার সবাই ওদের জ্বালায় অতিষ্ট।তবা যা অপকর্ম সব ওই সুশীলের।প্রতিদিনই পাড়ার লোকেরা সুশীলের বাবার কাছে নালিশ জানাতে লাগলো।বলতে লাগলো-“এই শেষ বারের মত সাবধান করে যাচ্ছি ,আর যদি আমাদের বাগান থেকে আম চুরি করতে দেখি,তো বেঁধে রেখে একেবারে পিঠে দাগ করে তবেই ছাড়বো।এই বলে গেলাম।সুশীলের বাবা আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো একটা ভাল মাস্টারের।যে ভয় দেখিয়ে সুশীল্কে ভাল ছেলে করে তুলতে পারে।পেয়েও গেল ওই ধরনের এক কঠিণ মাস্টার।একদিন বাজার করতে গিয়ে তার এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হতে সে সব কথা তাকে বললো।সেই বন্ধুই তাকে ওই ধরনের একটা মাস্তারের খোঁজ দিল।মাস্টারের নাম হরিকিঙ্কর চ্যাটার্জ্জী।তার সঙ্গে দেখা করে সমস্ত কথা বার্তা বলে বাড়ী ফিরে এল সুশীলের বাবা।পরদিন বিকেল পাঁচটার সময় মাস্টার হাজির।সুশীল তখন মাঠে ডাক্ গুলি খেলছিল।তার বাবা তাকে গিয়ে বললো “আজ একটা ভাল খাবার এনেছি,খাবি চ।”খাবারের কথা শুনে সুশীল একপায়ে খাঁড়া।বাবার সঙ্গে চলে এল বাড়ীতে।বাবাকে জিজ্ঞাসা করলো “কই খাবার কই?”বাবা ঘরের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললো ওখানে আছে।ঘরে ঢুকে সুশীলের যে কি অবস্থা হয়েছিল তা আর বলে বোঝাবার দরকার নেই।মুখটা তার সাদা চুন হয়ে গেল।কিছুটা রাগে আর কছুটা ভয়ে।না জানি,ইনি আবার কেমন ধারা মাস্টার হবেন।বাবা ঘরে ঢুকে মাস্টারকে বললো “এই আপনার ছাত্র।এখন আপনার দায়িত্ব” বলে বাবা চলে গেল।মাস্টার কড়া গলায় বললো “দরজাটা বন্ধ করে দাও।”ওরে বাবারে মারবে ঠারবে নাকি?দরজা বন্ধ করেতে বলছে কেনরে বাবা?সুশীল গুটি গুটি পায়ে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল।এবারে তাকে আর বলতে হল না।এবারে সে আগে থেকেই সংস্কৃত বইটা নয়ে এল।মাস্টার বললো”আমি শুধু সংস্কৃত পড়াবো না।সব বিষয় পড়াবো।শুনে সুশীলের মাথায় বাজ পড়লো।ভাবলো সংস্কৃত তবুও ভাল ছিল।এ আবার সব বিষয় পড়াবে বলছে।এবারে আমি গেছি।

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

আবার পড়া শুরু হল।এবার বইগুলো তুলতে সুশীলের লোহার বড় বড় বিম তোলার মত ঠেকলো।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করলো।বইগুলো নিয়ে সে খাটে গিয়ে বসলো।এই মাস্টারটা বেশ ভালোই শেখায়।সে প্রথমে একটা অঙ্ক শেখালো সুশীলকে।খানিক পরে বললো “এবার ঐ ধরনের একটা অঙ্ক দিচ্ছি,দেখি করতে পারো কিনা,পারবে তো?”সুশীল মুখ কাঁচু মাচু করে বললো”চে-চেষ্টা করতে হবে।”ঠিক আছে।করতে পারলেই হল।আচ্ছা লেখ a2-2ab+b2-2 হলে(x2-y2)এর মান কত?সুশীল বললো স্যার,একটু জল খেতে যাবো?স্যার বললো যাও,তবে যেন আবার দেখে এসে করবে না।আমি আবার আরেকটা করতে দেবো।সুশোল তো আদৌ কিছুশোনেনি বা বোঝেনি।স্যার পড়িয়ে যাচ্ছে আর ও তখন ভাবছে একে কি করে তাড়ানো যায়।কিন্তু এখন সে কি করবে?একেই এরকম তেঁএটে স্যার।তার ওপর এতক্ষণ ধরে একটাই অঙ্ক বোঝালো।সে অঙ্কটা যদি সুশীল না পারে তাহলে…….।এখন তো আর কছু করার নেই।সুশীল জল খেয়ে এসে(ওটা এমনি জল খাওয়া)খাটে বসলো।হরিকিঙ্কর টঙ্ক্র দিয়ে বললো”নাও এবার অঙ্কটা করে ফেলো দেখি।”পাঁচ মিনিট হয়ে গেল,সুশীল্পেন্টাকে মুখে ঢুকিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।মাস্টার এবার বললো “কি হল,বসে বসে ছাদ দেখছো কেন?ওখানে কি অঙ্কটা করা আছে যে তোমায় দেখিয়ে দেবে?”সুশীল বললো-না মানে ঠিক মনে করতে পারছিনা।কি যেন হবে aস্কোয়ার—–।এবার হরিকিঙ্কর তেলে জলে জ্বলে উঠলো।রুদ্র মূর্তি ধারণ করে বললো কি?এতক্ষণ ধরে শেখালাম aস্কোয়ার করবার জন্য?তোমাদের মতন বজ্জাত ছেলে আমার অনাক দেখা আছে।তাদের কিভাবে টিট করে ফিট করতে হয় তাও আমি জানি।এরকম ভাবে তোমায় পড়ানো যাবে না।কাল আমি পিয়ারা ডালের নিয়ে আসবো।aস্কোয়ার করাচ্ছি।সুশীলের মা কি একটা বলতে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকছিল।মাস্টার তার নাকের সামনে দিয়ে রাজধানী এক্সপ্রেসের মতন ধাঁ করে বেড়িয়ে গেল।

    ষষ্ট পরিচ্ছেদ(সুশীলের প্ল্যান)

পরেরদিন সুশীলের মা বাবা তো একেবারে অবাক।যে ছেলে কোন্দিন স্কুলে যেতে চায় না দুসপ্তাহে হয়তো একদিন স্কুলে যায়,সেই ছেলে ওই দিন সকালে উঠে মাকে আগে থেকেই বলে দিল “মা,আজ স্কুলে যাব,তুমি আমার ভাত বসিয়ে দাও”।বাবা আবার জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে নিল আকাশে সূর্যটা ঠিকঠিক উঠেছে কিনা।ঠিক সময়ই সুশীল তার প্রাণের বন্ধু কিশোরের সাথে চলে গেল স্কুলে।সারা রাস্তা যেতে যেতে তাদের কত কথাই হল।স্কুলে গিয়েই সুশীল নিজের রূপে ফিরে এল।ভাল ছেলেরা ভাবলো আজকে হয়ে গেল।সবাইকে এবার জ্বালিয়ে মারিবে আপদটা।সুশীল আকটা চক নিয়ে ব্ল্যাক বোর্ডে আকটা শিপাঞ্জির ছবি এঁকে তলায় লিখে দিল ইতিহাস স্যার-তপন বাবু।সেদিন প্রথম পিরিয়ড ছিল ইতিহাসের।তপন বাবুই ইতিহাস পরাতেন।খুব রাগী স্যার।সবসময়ি হাতে একটা বেত থাকবেই।সবাই ওকে ভয় করে চলে।তবে সুশীলের কথে ছাড়।তপন বাবু ক্লাসে ঢুকেই নিজের নতুন রূপটা দেখে এত ক্ষেপ গেল যে নিজেই নিজের হাতে মারে বেতটা ভেঙে ফেললো।ত্রপর আঃ করে লাফিয়ে উঠল একফুট।তারপর হাত ঝাড়তে ঝাড়তে চিৎকার করে বললো”কে,কে এঁকেছে এটা।উঃ কি লাগলো।(এটা আস্তে বলল)।(আবার চিৎকার)এই হরি কে এঁকেছে এটা?”আমি জানিনা স্যার।স্যা সিবকটাকে বেঞ্চের ওপর নিলডাউন করিয়ে দিয়ে হন্ হন্ করে চলে গেল অফিস ঘরে,হাতে মলম লাগাতে।
ছুটির ঘন্টা পড়লো।আবার,সুশীল আর কিশোর কি সব ফিস্ ফিস্ করতে করতে রাস্তা দিয়ে যেতে লাগলো।মনেহয় কিছুর প্ল্যান করেছে সে।

    

সপ্তম পরিচ্ছেদ
ঠিক সন্ধ্যে পাঁচটার সময় মাস্টার হরিকিঙ্কর চাটুজ্জ্যে হাতে বেশ একটা তেল চকচকে বেত নিয়ে এসে উপস্থিত।এসেই সুশীলকে জিজ্ঞাসা করলো 'অঙ্কটা করেছো?'সুশীল বললো হ্যাঁ স্যার।তবে আমার একটা অঙ্কের উত্তর কি হবে তা জিজ্ঞাসা করার ছিল।মাস্টার বললো কি?তাড়াতাড়ি বলো।আজকে ওই অঙ্কটা দেখে নিয়ে বাংলা পড়াবো।কালই পড়াতাম।নেহাত মেজাজ গরম করে দিলে তাই।এই বলে সে টেবিলে বেতটা রেখে বসলো।সুশীল বললো স্যার,স্কুলের স্যার এই অঙ্কটা করে আনতে বলেছেন।অঙ্কটা হল তিনি মাসে দুহাজার টাকা মাইনে পান।তা থেকে একটা কুকুরের পেছনে তার খরচ হয় ১০০টাকা।তাহলে সেই কুকুরের মুখে কত টাকা খরচ হবে?স্যার আবার ক্ষেপে গেল।বললো পাগলের মত বকছো কেন?কোন স্যার এরকম কোন অঙ্ক দিতে পারেন না।এটা তোমারই বানানো।সুশীল মাথা নিচু করলো।পাশের জানলাগুলো খোলাই ছিল।কারণ তখন গ্রীষ্মকাল।মাস্টার যখন ক্ষেপেছে ঠিক তখনই ওই জানলা একটা বড় আকারের ইঁটের ঢেলা ছিটকে এসে একেবারে ঠিক মাস্তারের কপালে ঢাঁই।মাস্টারের মুখ দিয়ে কক করে একটা শব্দ বেরুলো।সুশীল মাথা নিচু করে বসেছিল।সে বললো কি হল স্যার?কি হল স্যার?দাঁড়ান আমি জল আনছি।মাস্টার তখন দুহাতে আঘাতের জায়গাটা চেপে ধরেছে।সুশীল ছুটলো জল আনতে।এই মুহূর্তেই বলে রাখি সেদিন সুশীলের মা বাড়ীতে ছিল না।সুশীলের মামার বাড়ী গিয়েছিল।আর ওর বাবাতো অফিসেই ছিল।অতএব সুশীল একা।সুশীল দৌড়ে গিয়ে এক গ্লাস জল নিয়ে এল।স্যারকে বললো দাঁড়ান স্যার ওখানটা জল দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে না হলে খুব ব্যাথা হবে।এই বলে সুশীল যেই জলটা মাস্টারের কপালে দিয়েছে অমনি "অরে বাবারে,গেনুরে,আমায় মেরে ফেললে রে,আমায় খুন করলে রে বলে কাতর আর্তনাদ করে একেবারে ঘরের বাইরে।আসলে জলটাতে সামান্য পরিমাণ বাথরুম পরিষ্কার করার অ্যাসিড মেশানো ছিল।বারান্দায় গিয়ে আবার মাস্টারের চিৎকার-"ওরে,আমার সর্বনাশ করলে রে।"মাস্টার তার জুতো পড়তে গিয়ে দেখে তার সোলটা ফালি ফালি করে কাটা।তাই দ্বিতীয়বার চিৎকার।মাস্টার আর এক মুহূর্তও ওখানে না দাঁড়িয়ে ওই কাটা শোলের জুতো পড়েই ওই ফাটা মাথা নিয়ে সোজা হাওয়া হয়ে গেল রাস্তায়।সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই সমস্ত কাজ কমপ্লিট।সুশীল এবার জানলার কাছে এল।কিশোরের সাথে হ্যান্ডসেক করে বললো তোর টিপটা কিন্তু অব্যর্থ।এই হল সুশীলের দুই মাস্টার বিদায় ঘটনা।এবার সুশীলের কি হল সেই কথাই বলি।
    অষ্টম পরিচ্ছেদ(মাস্টারের চিঠি)

মা বাবারা যখন বাড়ী ফিরলো তখন সুশীল তাদের বুঝিয়ে দিল যে,সে মাস্টারকে স্কুলের স্যারের দেওয়া একটা অঙ্ক করতে দিয়েছিল।সেটা না পেরে সেই মাস্টার সুশিলের ওপর রাগ করে পড়ানো ছেড়ে দিয়ে পালিয়েছে।মা বাবাও তেমন।ছেলের কথায় বিশ্বাস করে গেল।ভাবলো সত্যিই তো,সুশীল সেদিন স্কুলে গিয়েছিল।তখনই হয়তো অঙ্কটা দিয়েছিল স্যারেরা।আর ছেলে যখন একবার যেচে স্কুলে যাব বলেছে,তখন বুঝতে হবে এবার আমাদের ছেলে ভাল হচ্ছে।সেদিন তারা সুশীলকে কিছুই বললো না।পরের দিনও ছেলের স্কুলের প্রতি ভক্তি কত।সেদিনও সে স্কুলে গেল।তখন তার মাস্টার নেই।একেবারে এখন সে হাত পা ছাড়া।তাই স্কুলে এসে সে যা নয় তাই করতে লাগলো।একে চড় মারে,ওকে খিমচে দেয়।ভাল ছেলেদের আর এসব বরদাস্ত হল না।তারা কয়েকজন সোজা চলে গেল অফিসঘরে।হ্যাডস্যারকে সব জানালো।স্যারেদের নিয়ে উল্টো পাল্টা ছবি যে সেই আঁকে সে কথাও জানালো স্যারকে।তবে এসবের কিছুই সুশীল জানতে পারলো না।সেদিনও সে স্যারের প্রথম পিরিয়ড ছিল।সেই স্যারকে উদ্দেশ্য করে একটা ভূতের ছবি এঁকে রেখেছিল সে।আজ কিন্তু স্যার এই ব্যাপারটা সমন্ধে কোন প্রতিবাদ জানালো না।পকেট থেকে একটা চিঠি বার করলো।একবার পড়ে নিয়ে আবার পকেটে রাখলো।এবার স্যার বললো-“আজ,আমরা সব শিক্ষক বৃন্দ একটা চিঠি লিখেছি ওই বাঁদরটার বিরুদ্ধে।ছাত্ররা যদি এই চিঠিটায় নিজেদের হস্তাক্ষর দেয় তাহলে আমরা ওটা ওপর ওলার কাছে পাঠাবো।তিনি এর একটা ব্যবস্থা নেবেন।যারা হস্তাক্ষর দিতে রাজি তারা হাত তোল।পিছনের চার পাঁচজন বাদে সবাই হাত তুললো।এটা দেখে সুশীলের রাগের বদলে কেমন যেন ভয় ভয় মতন হলো।সে তো কোনদিন ছেলেদের তার বিরুদ্ধে পক্ষ নিতে দেখেনি আবার স্যারেদেরও এরকম রূপ সে দেখেনি।তাই সে বেশ একটু ভয়ই পেল।চিঠিটার পেছন দিকে একে একে প্রায় পঞ্চান্ন জন হস্তাক্ষর দিল।স্যার চিঠিটা নিয়ে আবার অফিস ঘরে নিয়ে এল।এসে আবার সকলকে বললো-“হেডস্যার একটি চিঠি লিখেছেন সুশীলের বাবাকে।আমি নিজে গিয়ে চিঠিটা দিয়ে আসবো ওর বাবাকে।”সুশীল এবার আরো বেশী দমে গেল।তার দূরত্ব পনাটাও দমে গেল।

    নবম পরিচ্ছেদ(দূরত্ব পনার সমাপ্তি)

সে দেখলো কোন ছেলেই তার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না।তার প্রিয় বন্ধু কিশোরও যেন কেমন বদলে গেছে।সুশীল তাকে জিজ্ঞাসা করলো”হ্যা রে ক্লাসের সব ছেলেরা আমার সঙ্গে কথা বলছেনা কেন কিছু জানিস?”কিশোর উত্তরে বললো সবাই বলছে বদ ছেলেদের সঙ্গে কেউ কথা বলে না।এদিকে সেই স্যার(স্কুলের)হেডমাস্টারের চিঠিটা নিয়ে গেল সুশীলের বাবার কাছে।ওর বাবা তখন অফিস থেকে বাড়ী এসেছে।ওর বাবাকে চিঠিটা দিয়ে বললো আপনার ছেলের সমন্ধে স্কুলের ছাত্রদের এবং শিক্ষকদের অনেক অভিযোগ আছে।হেডস্যার আপনাকে এই চিঠিটা লিখেছেন আপনার ছেলেকে সাবধান করে দেওয়ার জন্য।যদি ওর স্বভাবের পরিবর্তন না করে তাহলে এবারের পরীক্ষায় তো ওকে বসতে দেওয়া হবেই না,ওকে স্কুলেও রাখা হবে না।এটা আপনার ছেলেকে বলে দেবেন।এই বলে স্যার চলে গেলেন।তখন সুশীলের মা বাবার যে কি হল সেটা নিশ্চয় লিখতে হবে না।বিকেল সাঁড়ে পাঁচটা বেজে গেল সুশীল বাড়ী যাচ্ছে না।ও ভাবছে আজ বাড়ী গিয়ে সে কি বলবে?তার ওপর স্যার নিজে গিয়ে হেডস্যারের লেখা চিঠি তার বাবা মাকে দিয়ে এসেছে।এখন হয়তো তার বাবা তাকে বাড়ী ঢুকতেই দেবে না।তবুও বাইরে বাইরে আর কতক্ষণ ঘুরবে।ভাবছে বাড়ী তো যেতেই হবে।ক্ষিদে তো একসময় পাবেই।তাই এখনই গিয়ে দেখি বাড়ীর অবস্থা কেমন।এদিকে সুশীলের বাবা বারান্দায় ঘন ঘন পাইচারি করছে।ভাবছে এই ছেলেকে নিয়ে এবার তার কি হবে।যার নামে পাড়ার লোক,স্কুলের ছেলে,মাস্টার সবাই অভিযোগ করে তাকে এবার কি করা যায়।এখনো সে ছেলের পাত্তা নেই।এমন সময় সুশীল এসে পৌঁছল বাড়ীতে।তার বাবা সঙ্গে সঙ্গে তাকে বললো”এক্ষুনি বেড়িয়ে যাও।তোমার মতন বদ ছেলেকে আর ঘরে ঢুকতে দেব না।সকলে তোমার নামে অভিযোগ করে করে আমাকে পাগল করে দিচ্ছে।আর আমি শুনতে চাই না।যাও যেখানে খুশী যাও।”এই বলে ঘরে ঢুকে দরাম করে তার মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ করে দিল।সুশীল আর কি করে।খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে সে হাঁটতে হাঁটতে চললো।প্রথমে সে গেল কিশোরের বাড়ী।কিশোরকে দেখতে পেল জানলার ধারে।দূর থেকেই সুশীল তাকে বললো এই কিশোর একটু শোন তোর সাথে কথা আছে।এই বলে যখন সে কিশোরের কাছে এল তখন কিশোর তাকে বললো”তুই আমার সাথে একদম কথা বলবি না।বাবা বলে দিয়েছে তোর সঙ্গে আর যদি কথা বলি,তাহলে আমাকে বাড়ীতে ঢুকতে দেবেনা।”এই কথা শোনারপর সুশীল সেখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না।সোজা চলে এল একটা পুকুরের পারে।তখন সবে সন্ধ্যা সন্ধ্যা হচ্ছে।সুশীল পুকুরের ধারে বসে জলে ঢিল মারতে লাগল।এবার সে কি করবে।সে ভেবেছিল কিশোরের সঙ্গে বুদ্ধি করে না হয় বাড়ীতে আবার ঢোকা যেত।কিন্তু এখন তার একমাত্র বন্ধু কিশোরও আর তার সঙ্গে নেই।

    দশম পরিচ্ছেদ(সাধু বাবার উপদেশ)

পুকুর ধারে বসে আছে,এমন সময় এক সাধু বাবা সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন।ওকে ওই ভাবে পুকুর পারে বসে থাকতে দেখে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন “বাবা তুমি ওইটুকু ছেলে,এই সন্ধ্যাবেলা একা পুকুরপারে বসে কি করছো?”সুশীল তখন তাকে সব কথা বললো।সব শুনে সাধু বাবা তাকে বললেন “তোমার সঙ্গে যা করা উচিত ছিল তাই করেছে সকলে।এখন যদি তুমি নিজেকে পালটাতে পারো তাহলে নিশ্চয়ই তুমি সকলের বন্ধু হতে পারবে।এখন থেকে তু্মি গুরুজনদের ভক্তি করতে শেখো,বন্ধুদের ভালোবাসতে শেখো,মন দিয়ে পড়াশুনা করো।দেখবে তুমি ঠিকই এবারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে।এখনও তিন মাস বাকি পরীক্ষার।মন দিয়ে পড়াশুনা করো।”এই বলে তিনি সুশীলের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন।

    একাদশ পরিচ্ছেদ(সুশিলের পরিবর্তন)

সাধু বাবা মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করার পরই সুশীলের মনটার যেন কেমন পরিবর্তন হয়ে গেল।সমস্ত শয়তানি বুদ্ধিগুলো সব মাথা থেকে চলে গেল।সে উঠে দাঁড়াল পুকুর পাড় থেকে।তারপর সোজা চললো বাড়ীর দিকে।বাড়ী গিয়ে দেখলো দরজাটা সেরকমই বন্ধ রয়েছে।দরজায় কড়া নাড়লো।তার মা দরজাটা খুললো।সুশীল অমনি এক চোখ জল নিয়ে মাকে বললো”মা আমাকে বাড়ীতে ঢুকতে দাও।আমি বলছি আমি আর কোনদিন শয়তানি করব না।এবারের পরীক্ষায় ঠিক পাশ করবো তুমি দেখো।”মা সেগুলো শুনেও বিশ্বাস করতে পারছিল না যে সে সত্যি সত্যি এগুলো বলছে না বাড়ীতে ঢোকার জন্য বলছে।যাই হোক এবার তাকে আর কিছু বললো না।সুশীল ঘরে ঢুকে সোজা চলে গেল তার পড়ার ঘরে।সেখানে গিয়ে সে পড়ার বইগুলো নিয়ে বসলো।সুশীলের বাবা পাশের একটা দোকানে গিয়েছিল।ফিরে এসে সুশীলকে পড়তে বসতে দেখে তো অবাক।কিন্তু তাকে কোন কথা বললো না বা কোন কথা জিজ্ঞাসা করলো না।অন্য ঘরে চলে গেল।তার বাবা ভাবলো প্রত্যেক বারের মতন এটাও হয়তো তার কোন একটা ছল।কিন্তু না,সুশীলের এই পরিবর্তন পরেরদিন পর্যন্ত লক্ষিত হল।সকালে যথারীতি পড়তে বসলো।তারপর স্কুলে গেল।স্কুলের ছেলেরা ও শিক্ষকেরাও তার পরিবর্তন দেখতে পেল।কিন্তু কেউ কিছু বললো না।তারা বুঝতে পারলো হয়তো সেই চিঠির জন্য সুশীলের এই পরিবর্তন হয়েছে।এইভাবে চলতে লাগলো দিনের পর দিন।সকলেই ভাবে আজ হয়তো সুশীল আবার নতুন করে তার শয়তানি শুরু করবে।কিন্তু না সুশীলের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছে।সে কারোর সঙ্গে বেশী কথা বলে না।একদম খেলাধুলা করে না।(খেলবে কার সঙ্গে।বন্ধুরা তো তার সঙ্গে কেউ খেলতে চায় না।)বেশীরভাগ সময় পড়াশুনা করে কাটায়।কিছু সময় গল্পের বই পড়ে।তাকে এইভাবে দেখতে দেখতে সবাই অবাক হয়ে যেতে লাগলো।সবাই বলতে লাগলো’পরিবর্তনশীল সুশীল’।

    দ্বাদশ পরিচ্ছেদ(পরীক্ষা এগিয়ে এল)

স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার আর সতেরো দিন বাকি।সুশীলের বাবা মা ওর পরিবর্তন অনেকদিন ধরে লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো সুশীল এবার সত্যিই ভাল হয়ে গেছে।বিভিন্ন কথার মাধ্যমে তার বাবা তাকে পরীক্ষা করে দেখেছে।যেমন পরীক্ষা হবে চোদ্দ তারিখ থেকে।বাবা সুশীলকে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে বললো-“কি রে সুশীল চোদ্দ তারিখ দীঘা যাব ঠিক করেছি তুই যাবি নাকি?”(তার বাবা জানতো চোদ্দ তারিখ সুশীলের পরীক্ষা শুরু।কিন্তু সুশীল কি বলে সেটা জানবার জন্যই এই কথা বলা।)সুশীল বলল-“এ বাবা তুমি চোদ্দ তারিখ যাওয়ার জন্য ঠিক করলে কেন?ওই দিন তো আমার বাংলা পরীক্ষা।”এইভাবে আরও পরীক্ষা করার পর ওর বাবা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে গেল যে,সুশীল আর শয়তানি করবে না।আবার এখন পরীক্ষার মুখে কোন পড়ানোর মাস্টারও পাওয়া যাবে না যে পরীক্ষার এই কটা দিন ওকে ভালভাবে তৈরি করে দেবে।আর কোন মাস্টার সুশীলকে পড়াতে আসবেও না।তাই অগত্যা সুশীলের বাবাই নিলেন ছেলেকে পড়ানোর দায়িত্ব।প্রতিদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে এসে সুশীলকে পড়াতেন তিনি।বাবার পড়ানো চললো সুশীলকে আর সুশীলের জন্য চললো মানসিক্।বিভিন্ন ঠাকুরের কাছে মানসিক্ করতে লাগলেন তিনি।ছেলেটা যেন এবারে ভালভাবে পাশ করে যায়।অবশেষে পরীক্ষার দিন এল।সুশীল ভোর সাড়ে চারটে থেকে উঠে পড়তে শুরু করলো।এখন যেন সে বই ছাড়া কিছুই চেনে না।বইকে যেন সে সর্বদা চোখে চোখে রাখছে।সারা বছর না পড়েও এই কদিনেই সে সমস্ত সিলেবাস শেষ করে ফেলেছে।চেষ্টাতে কি না হয়।পরীক্ষা দিয়ে ফিরে এল সুশীল।বাড়ীতে ঢুকে মুখ ভার করে কোন কথা না বলে আবার চলে গেল পড়ার ঘরে।মা তার এই অবস্থা দেখে খুবই চিন্তায় পড়লো এই ভেবে যে সুশীলের পরীক্ষাটা ভাল হলো না নাকি?
এইভাবে চলতে চলতে অবশেষে শেষ হল পরীক্ষা।প্রত্যেকটা পরীক্ষা দিয়ে এসেই সুশীল বাড়ীতে কোন কথা বলতো না।কেমন হয়েছে তাও জিজ্ঞাসা করতে পারতো না সুশীলের মা।বুঝতেই পারতো পরীক্ষা ভাল হয়নি।শেষ পরীক্ষা যেদিন হল সেদিন তো সুশীলের আর কোন পড়া রইলো না।ঘরে এসে চুপ করে বসলো।এইদিনই তার মা জিজ্ঞাসা করলো-“কি রে পরীক্ষা কেমন হল কিছুই তো বললি না।আজ বল কেমন হল?”সুশীল বললো-‘মোটামুটি’।

    ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ(পরীক্ষার পর)

পরীক্ষার পর সুশীলের তো আর কোন কজ নেই।পড়ারই বা কি আছে?পাশ যদি করেও যায় তবে নতুন ক্লাস।তাই আগের বইগুলো আর পড়ার দরকার নেই।আর যদি এবারেও পাশ না করে তাহলে তো নতুন ক্লাসের বইও পড়তে পারবে না।মা বাবা এখন দোটানায় পড়েছে কোন মাস্টার ঠিক করতে পারছে না।কি পড়াবে এখন সুশীলকে?আবার কোন কিছুর মধ্যে না রাখলে সুশীল আবার আগের মতন দুরন্ত হয়ে উঠতে পারে।
একদিন ওর বাবা মা ঠিক করলো সুশীলকে কিছুদিনের জন্য ওর মামার বাড়ী পাঠিয়ে দেবে।ওখানে ওর ছোটমামাই ওকে ঠিক করে রেখে দেবে।খেলার বন্ধুও ওখানে আছে কিছু।এখানে তো যা বন্ধু আছে তাদের পাল্লায় পড়লে এবার সুশীলের অবস্থা……।আর যারা ভাল বন্ধু ছিল তাদের বাড়ীর অবিভাবকেরা তো সুশীলের সঙ্গে মিশতেই বারণ করে দিয়েছে।সুতরাং……।সুশীলকে বলতে সেও রাজি মামার বাড়ী যেতে।অবশেষে তাকে তারা নিয়ে গেল মামার বাড়ী।যাবার সময় বলে দিল সে যেন ওখানে গিয়ে শান্ত ভাবে থাকে।কথাটা বলেই মা বললো-“আমি জানি,তুই আর বদমাইসি করবি না কোনদিনও।এতদিনে তুই আমাদের মুখ রাখবি।তাই এটা বলার কোন দরকের নেই।”এই কথা শুনে সুশীলের মনে আবার নতুন করে ভাল হবার চিন্তা জাগল।এখন তার যা অবস্থা অনেক চেষ্টা করলেও আবার সেই দুরন্ত সুশীল হয়ে উঠতে বেশ বেগ পেতে হবে।
ট্রেন থাকে নেমে মামার বাড়ী আরো বেশ খানিকটা।মাঠ দিয়ে দিয়ে যেতে হয়।গ্রাম্য পরিবেশ।স্টেশনে নেমেই সুশীলের বাবা সুশীলের মাকে বলে দিল-তিনি তাদের আগেই ওখানে চলে যাবে।আগে গিয়ে তাদের সুশীলের পরিবর্তনের কথা বলে দেবে।সুশীলকে নিয়ে তার মাকে আস্তে আস্তে এগোতে বলে তিনি খুব জোড়ে হাঁটতে শুরু করলেন।
সুশীল এল মামার বাড়ী।সকলে তার কথা আগে থেকেই ওর বাবার মুখে শুনে নিয়েছিল।এখন তাকে দেখেই বুঝতে পারলো এ সুশীল আর সে সুশীল নেই।বেশ আদর করেই রাখলো তাকে।বেশ আনন্দেই মামার বাড়ীর দিনগুলো কাটতে লাগলো সুশীলের।তার ছোটমামা প্রতিদিন সকাল বিকাল সুশীলকে নিয়ে বেড়াতে যেত গ্রামের মাঠে।সেখানে ঘুরতে ঘুরতেই তাকে ভাল হবার কথা শেখাতো।বিভিন্ন উপদেশ দিত।জিজ্ঞাসা করলো-“হ্যা রে এবার তোর পরীক্ষা কেমন হয়েছে?”সুশীলের সেই আগেরই উত্তর’মোটামুটি’।মামা বললো দেখ এবার তুই যদি পাশ করে উঁচু ক্লাসে উঠতে পারিস তাহলে এখন থেকেই আমি তোকে এখানে কিছুদিন থাকবার জন্য নেমন্তন্ন করলাম।তোকে প্রতিদিনই এখানকার বিখ্যাত ল্যাংচা খাওয়াব।ওটা তো তোর খুব প্রিয়?সুশীল বললো-হ্যাঁ।এইভাবে চলতে লাগলো দিনগুলো।অবশেষে রেজাল্ট বের হবার দুদিন আগে সুশীলকে ওর ছোটমামাই দিয়ে গেল বাড়ীতে।

    চতুর্দশ পরিচ্ছেদ

পরীক্ষার ফল বের হবার দিন আজ।সুশীলের আজ যেন অগ্নিপরীক্ষা।তার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো মা বাবার মুখ।যাঁরা সবসময় তার ভাল ফল কামনা করে।ভাসতে লাগলো বন্ধুদের মুখ।সেই সব বন্ধুদের মুখ যাদের বাড়ীর লোকজন তাদের সুশীলের সঙ্গে খেলা ঘোরা বন্ধ করে দিয়েছে।মনে পড়ছে মামার কথাগুলো।”তোর এবার পাশ করতেই হবে।”এইসমস্ত ছবি কথা যখনই সুশীলের মনে পড়ছে তখনই তার বুক কেঁপে উঠছে ভয়ে।যদি এবারও সে পাশ না করতে পারে।এই সুশীলকে এবার পাশ করতেই হবে।না হলে……..।এগারোটা বাজে।সুশীল বেড়িয়ে পড়লো রেজাল্ট আনতে।বাবা অফিস চলে গেছে বিশাল চিন্তা মাথার মধ্যে নিয়ে।মা সমস্ত কাজ ফেলে রেখে ঠাকুর ঘরে বসে ঠাকুরকে ডেকে চলেছে।সুশীলের আসার সময় হলে তার মা বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।হঠাৎ দেখতে পেল সুশীল আসছে।বুকটা ধরফর করছে সুশীলের মায়ের।সুশীল কাছাকাছি আসতে তার মায়ের বুক ধরফরানি আরও বেড়ে গেল।সুশীল হাতে রেজাল্ট নিয়ে মাথা নিচু করে মুখ গোমড়া করে এগিয়ে আসছে।ফল বুঝতে বাকি রইলো না।সুশীলের মা কেঁদে ফেললো।সুশীল ঘরে ঢুকতেই জিজ্ঞাসা করলো “সুশীল কি হল রে?”সুশীল কিছু না বলে রেজাল্টটা এগিয়ে দিল।মায়ের হাত কাঁপছে।কাঁপা কাঁপা হাতেই রেজাল্ট খুলে দেখলো…..।কি দেখলো?হ্যাঁ।সুশীল এবার খুব কম নম্বর পেলেও পাশ করে গেছে।মা এবার অঝোর ঝরে কেঁদে ফেললো।সুশীলকে আস্তে করে একটা চড় মেরে বললো”পাশ করে গেছিস তো।তাহলে অমন মাথা নিচু করে,গোমরা মুখে এলি কেন মুখ পোঁড়া।”সুশীল বললো-“রেজাল্ট যে ভাল হয়নি,আরও ভাল হতো।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *