পুরাকালে বিভিন্ন রচনাগুলিতে অনেক ক্ষেত্রেই রূপকের ব্যবহার হত। যাতে সেইসব কাহিণী অনেক আকর্ষনীয় ও শ্রুতিমধুর হয়। আসলে হয়েত আজকের মতই ব্যপারটা ছিল। যখন মানুষ অতশত তত্বকথা শুনতেও চাইত না। বা হয়েত তা শোনার বা জানার মত জ্ঞান বা অধিকার বা যোগ্যতাও ছিলনা হতে পারে। তাই সুন্দর করে গল্পের আকারে তা লেখা হত যাতে তা সকলেরই পাঠ্যযোগ্য হয়। এবং সরল ভাষায় নিতিশিক্ষা ও ধর্মশিক্ষা দেওয়া যায়। আর সেই গ্রন্থগুউলিকেই আমরা পুরান বলে চিনি। সেই রুপক গুলি উদ্ধার করতে পারলে বা তাদের অভ্যন্তরের নিহীত জ্ঞানটিকে অনাবৃত করতে পারলে পাই এক অপূর্ব অনুভুতি। নতুন সুন্দর কিছু জানতে পারার অনুভুতি। আসুন একটু জানার চেষ্টা করে দেখা যাক কেমন লাগে। আসলে আমাদের হিন্দুধর্মের বিষয়বস্তু হল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত। আর আমাদের ধর্মগ্রন্থগুলিতে লেখা বিষয়গুলিও তাই। শুধু কিছু মানুষের বোঝার ভুলে অনেক তর্ক, ভুলবোঝাবুঝি ইত্যাদির সৃষ্টি হয়। যদি কেউ ভেতর থেকে এর আসল মানে বা ভাব গ্রহনের একটুও চেষ্টা করেন তাহলে তিনি যে অপার জ্ঞানসমুদ্রের সন্ধান পাবেন তা হয়ত অন্য কোন কিছুতে পাওয়া যাবেনা। আর এটাই আমাদের এই সুন্দর ধর্মের বিশিষ্টতা ও বিশালতা। তবে আসলে হয় কি, আধ্যাত্মিক পড়াশোনায় অভ্যস্ত যাঁরা তারাই এইধরনের রসাস্বাদন করতে সমর্থ হন। সাধারন মানুষেরা সেই উচ্চতায় তা বুঝতে পারেনা বলেই কিন্তু এই বিশালতা একটি গন্ডিতেই সিমাবদ্ধ হয়ে রয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার মতে এই বিষয় এমন কিছু বিষয়বস্তু রয়েছে যা কিন্তু সাধারন মানুশেরও বোঝা সহজ। শুধু ভাষা প্রয়োগ বা বোঝানর সরলতাটুকু লাগবে। আমি চেষ্টা করছি সেই কাজে কিছুটা এগোতে। নিজের ভেতরে আধ্যত্মিক শক্তির জাগরণের পদক্ষেপগুলির সুন্দর উদাহরন হল পৌরানিক সমুদ্রমন্থনের কাহিনী। সাধারন এই বহুলপ্রচলিত কাহিনীটি অনেকেরি জানা। কিন্তু এই গল্পের মাধ্যমে যে কত গভীর একটি শিক্ষা পাওয়া যায় তা জানতে পারলে সাধারন মানুষ যারা এই ধরনের আধ্যাত্মীক পড়াশোনা প্রায় করেনিনা তাদের থেকে শুরু করে যারা করেন তাদের অবদি সকলেরই খুব ভালো লাগবে এই আশাই করি। আমি সরল ভাষায় সেই ব্যখ্যা করছি এখানে। সমুদ্রমন্থনের কাহিনী এখানে আর সবিস্তারে দিলাম না কারন আশা করি সকলেরই তা জানা আছে কিছুটা হলেও। তাই শুধু মুল আলোচনাতেই প্রবেশ করি সরাসরি। এই সমুদ্রমন্থন করেছিলেন দেবতা ও অসুররা মিলে। এখানে সমগ্র মন্থন কর্মটি হল আমাদের নিজেদের শরীরের আধ্যাত্মিক জাগরন, একাগ্রতা, আকাঙ্খা বা কামনাকে জয়, এবং সর্বপরি রিপুকে জয় করে পরমাত্মাকে লাভ করার পদ্ধতি। দেবতা হল আমাদের শরীরের ধনাত্মক শক্তি (Positive Energy), আর অসুর হল এর উলটো অর্থাৎ ঋণাত্মক শক্তি (Negative Energy) এর প্রতিক। আমাদের উদ্দ্যেশ্য এই ঋণাত্মক শক্তিগুলিকে দমন করে ধনাত্মক শক্তির মাধ্যমে সেই অমৃত অর্থাৎ পরমাত্মাকে লাভ করা। এখানে অমৃত আর কিছুই নয়, সয়ং পরমব্রমহ পরমাত্মার প্রতিক। রূপকটির মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে যে একটি কর্ম করতে আমাদের মধ্যে উপস্থিত দুই ধরনের শক্তিই একিসাথে কাজ করে।কিন্তু যদি ধনাত্মক শক্তি বিজয়লাভ করতে পারে তবেই আমরা পাব অমৃতের সন্ধান। এখানে এই সুত্রে এই উল্লেখও করেদি যে গীতার মুলকথাও কিন্তু এটিই। যেখানে পান্ডব ধনাত্মক ও কৌরব ঋনাত্মক শক্তির প্রতিক আর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধজয় হল সেই পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হয়ার জন্যে শরীরের আভন্ত্যরীন যুদ্ধ। যা যেকোন সাধককেই পেরিয়ে আসতে হয়। মন্থন কাহিনীতে ফিরে আসি। এখানে ক্ষীরতসমুদ্র মানুষের চিন্তার প্রতীক। যার বিস্তৃতি ব্যাপক। সাধকের সাধনার শুরুতে এবং বিভিন্ন পরদক্ষেপে নানা ধরনের চিন্তার উদয় হয়। তাই হল এই সমুদ্রের ঢেউ। অর্থাৎ চিন্তার ঢেউ। যাকে প্রশমিত না করতে পারলে সাধনাইয় সিদ্ধিলাভ কদাপী সম্ভব নয়। মন্ধারা পর্বত হল একাগ্রতার প্রতিক। পর্বত সোজা অনর ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে একই স্থানে। তেমনই হওয়া উচিত সাধকের একাগ্রতা। ওই সমুদ্রের মাঝে ওই পর্বতের এটাই অর্থ দাঁড়ায় যে সাধকের সাধনার বাঁধা হয়ে উঠে আসা চিন্তাগুলির ওপরে নিজের একাগ্রতাকে পর্বতের মত কঠিন ভাবে চেপে রাখতে হবে। মন্ধারা নামকরণটিও শুনুন এবার। মন + ধারা। মন কে একটি নদীর ধারার মতই একটি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত কর। এটাই এর রূপকার্থ। মন্ধারা পর্বতটিকে নিজের পিঠে ধারন করেছিলেন ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণুর অবতার কুর্ম। এখানে কুর্ম অবতারের রূপকটি কি? এটি আরো সুন্দর ও মনজ্ঞ। কচ্ছপ এমন একটি প্রাণী যে নিজের শরীরের অংশগুলিকে নিজের কঠিন খোলোসের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে পারে। ঠিক তেমনি সাধকের প্রয়োজন ওইসব বাহ্যিক চিন্তাগুলিকে প্রশমিত করতে গেলে আপন একাগ্রতার দ্বারা চিন্তা ও ইচ্ছাগুলিকে প্রশমিত করে রাখা। নিজের মধ্যেই গুটিয়ে ফেলা। তবেই সাধনার উপরিস্তরে পৌঁছনো সম্ভব। বাসুকি হল ইচ্ছাশক্তির প্রতিক। যেখানে সেই পরমাত্মাকে লাভকরার ইচ্ছায় এর সাহায্যে আপম কর্ম করে যাওয়া হচ্ছে। প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। আবার দেখুন বলা হচ্ছে বাসুকির মুখথেকে বেরহচ্ছে প্রচন্ড গরল। এর অর্থ ইচ্ছা যদি খারাপ হয় তা ক্ষতিকরও হয়ে ওঠে, তাই সৎ ইচ্ছাই কাম্য। অসৎ বা ভুল ইচ্ছা নয়। এবার কোন ইচ্ছা অসৎ বা ভুল তা কিকরে বুঝব সে বিষয় পরে আলোচনা করব। মন্থনের শুরুর দিকেই উঠে এল গরল। এর অর্থ সাধনার শুরুতে আসা বাঁধা। বিভিন্ন কষ্ট সহ্য করা ইত্যাদি। অর্থাৎ শরীরের দিক দিয়ে আসা নানান প্রতিবন্ধকতা। ভগবান শিব এখানে শক্তি, সাহস, চেষ্টা ও ইচ্ছাশক্তির প্রতিক। এই গুনগুলির দ্বারাই সেই বিষতুল্য বাঁধাগুলিকে প্রশমিত করা যায়। তাই যেন বলা হয়েছে একমাত্র তিনিই পারেন। এর অর্থ শিবের মত গুনাবলি প্রয়োজন এগুলিকে প্রশমিত করার জন্যে। তাই শিবকে সবথেকে বড় সাধকও বলা হয়। এরপর বেরতে শুরু করল বিভিন্ন দামি মণিমুক্ত, ধনরত্ন। এগুলি হল সাধনার উন্নতির ফলে প্রাপ্ত বিভিন্ন সিদ্ধি। প্রথমের ওইসব বাঁধাগুলিকে প্রশমিত করার পরে ধীরে ধীরে সাধক নানান দামি সিদ্ধীর অধিকারি হতে পারেন। এখন এবিশয় আর সুন্দর ব্যখ্যা দি। ওইসব প্রাপ্ত সিদ্ধীগুলির লোভে বা মোহে পরে সাধক যদি আপন সাধনার মুল উদ্দেশ্যই ভুলে যান বা তার থেকে সরে আসেন তার অনেক সুযোগ থেকেই যায়। তাই সাধককে এবিশয় যথেষ্ট সচেতন থাকা আবশ্যক। নাহলে সেই পরমাত্মাকে লাভ সম্ভব নয়। আর তাই দেখান হয়েছে সেইসব উঠে আসা দ্রব্যাদি দেবতা ও অসুরেরা ভাগ করে নিয়ে আবার মন্থনে লেগে গেল। থামা চলবে না। নিজের লক্ষচ্যুত হওয়া চলবে না। মোহিনী হল সেই মায়া যা মানুষকে লক্ষ্যচ্যুত করে। পথভ্রষ্ট করে। তাই অসুরের উপমার মাধ্যমে মানুষকে এটাই বোঝান হয়েছে সে সল্পবুদ্ধির ন্যায় সামান্য কিছুর লোভে পরে আসল ধনকে ভুলে যেওনা। ধন্বন্তরি হল সেই শারিরিক শক্তি ও সুরক্ষা ও নিরোগের প্রতিক যা সাধনার পূন্যফলের দ্বারা সাধক প্রাপ্ত হন। আর সর্বশেষে অমৃত হল সেই পরমাত্মার প্রতিক। দেখুন একটা বিষয় আর গুরুত্বপূর্ন যে অমৃত ওঠাতে দুই দলই কিন্তু পরিশ্রম করল। একই স্থানে থাকা সত্তেও কিন্তু দেবগনই বুঝলেন তার মহত্ত। অসুররা প্রথমে বোঝেনি। এর অর্থ আসুরি শক্তিতে আসল জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া দুরুহ। আবার তাদের গুরু শুক্রাচার্য্য তাদের জানালেন ইন্দ্রের পুত্র জয়ন্ত ওই অমৃত কুম্ভ নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ গুরু কিন্তু গুরুই হন। সে খারাপের গুরু হলেও তিনি জ্ঞানী। তাই অসুররা না দেখতে বা জানতে পারলেও গুরু কিন্তু জানতে পারেন। এখানেই গুরুর ক্ষমতার উদাহরন। এই হল সমুদ্রমন্থনের সরলার্থ। আমি নিজের মত প্রচেষ্টা করলাম যথাসম্ভব বোঝানোর। আমি সাধক নই। তাই অজ্ঞানে ভুল কিছু লিখে থাকলে মার্জনা করবেন।
****************************************************
Leave a Reply