ওম (Om – Complete)

দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য

মুখবন্ধ

(ভূমিকা লিখতে বসে আমি যা দেখলাম যে সেটাতেই একটা ছোটখাটো বই হয়ে যাবে। তাই তাকেও আবার বহু কষ্টে সংক্ষিপ্ত করে আমি ঠিক করলাম এমন এক ধরনের মুখবন্ধ লিখি যা হয়েতো আজ অবদি কোন গ্র্যন্থে রচিত হয়েনি। আমি ভূমিকাটিকেও কয়েকটি পর্বে ভেঙ্গে দিলাম। কারন আমার এই গ্রন্থ রচনার যে উদ্দেশ্য তা বিরাট। বিপুল। যার ব্যপারে বলতে গেলে কম পরিমান স্থানে তা সম্ভব নয়। আর তাছাড়া এই গ্রন্থ যাদের মূল উদ্দেশ্য করে লিখতে চলেছি তাদের মনস্তাত্মীক স্তর ভিন্ন। তাই আমি কয়েকটি পর্বে ভেঙ্গে দিয়েছি আমার গ্রন্থে ভূমিকা।)

যারা নিজেদের নাস্তিক বলে গর্ব করেন তাদের জন্যে

আমি সনাতন ধর্মে জন্মগ্রহন করেছি। এ আমার পরম সৌভাগ্য। আমি জানি সে কথা, কিন্তু আরও পাঁচজন সনাতন ধর্মে জন্মগ্রহন করা মানুষ কি তা মানেন? সনাতন ধর্ম, যাকে আমরা হিন্দু ধর্ম বলেও জানি, একথাই হয়েত অনেকের জানা নেই, নিজের ধর্মটার মুল কথা জানা তো দুরঅস্ত। আমি একজন হিন্দু হওয়ার যে সৌভাগ্যের কথা বলছি, সকলেই কি তা মন থেকে মানেন যে তিনি হিন্দু হয়ে জন্মেছেন এ তার পরম সৌভাগ্য? কেন মানেননা জানেন? আপনি হিন্দু বা সনাতন ধর্মের যে কি মহানতা, এর ভেতরে যে কি অপরিসীম, অকল্পনীয় বিজ্ঞান ও জীবনচেতনা লুকিয়ে আছে তা আপনাদের জানা নেই। কখনো জানার চেষ্টাটুকুও কি করে দেখেছেন? কোন মহান ব্যাক্তি বা হিন্ধু ধর্মের সম্পর্কে প্রগার জ্ঞান আছে এমন কোন মানুষের কাছে বসেছেন কি সৎসঙ্গ করতে? তবে কিভাবে জানবেন এই মহান ধর্মের মহানতা। যেখানে সামান্য কোন অজানা বিষয় সম্পর্কে জানতেই আমাদের ওপরের সাহায্য নিতে হয় সেখানে কিভাবে আপনি এই সৎসঙ্গ ছাড়া সেই মহানতার আন্দাজ পাবেন? অনেকে হয়েতো বিজ্ঞানের কিছু তথ্য জেনে নিজেকে এতোটাই পন্ডিত ভাবছেন যে আসল বিজ্ঞানটিকেই শুধু কিছু কুসংস্কার আর মিথ্যা বিশ্বাস ভেবে উড়িয়ে দিলেন। কিন্তু ভেবে দেখুন আপনি সেই বিজ্ঞানটুকু জেনে কিন্তু মহান কিছু করতেও পারেননি। যদি আইনস্টাইনের মতন কোন একজন হতে পারতেন তবুও বুঝতাম আপনার জ্ঞান সার্থক। কই তাওতো হলনা। কেন হয়েনি জানেন? কারন আপনার জ্ঞানে অনেক ফাঁক থেকে গেছে। আইন্সটাইন নিজেও কিন্তু ঈশ্বরের শক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। কারন? কারন যা আসল জ্ঞান তাই যদি না পান তবে জ্ঞাণী হলেন কিকরে? তবে আপনার এই যে ধর্মের প্রতি বিরূপ ভাব তার কারনও অস্বীকার করিনা। সত্যজ্ঞানের অভাবেই এই জগতে সৃষ্টি হয়ে এসেছে একের পর এক কুসংস্কার। মানুষ অন্ধকারে দুবে থাকছে আর সেই সুযোগের সদ্ব্যাবহার করে জন্ম নিয়েছে হাজার হাজার লোক ঠকানো জ্যোতিষী, তান্ত্রিক, বাবা ইত্যাদি। যেখানে জ্যোতিষ শাস্ত্র একটি অতি উন্নত বিজ্ঞান সেখানে এই সমস্ত ভন্ড মানুষদের নিচ মানসিকতা, ও লোভের কারনে সেই অতি উত্তম শাস্ত্রকে ভুল কাজে ব্যাবহার করার ফলে আজ মানুষ সেই শাস্ত্রকেও অবহেলা করছে। জ্যোতিষের কথা শুনলেই তাই আজ শিক্ষিত মানুষরা জ্যোতিষশাস্ত্রের কত শক্তি, কত উন্নত সেই বিজ্ঞান তা না জেনেই, বা তার বিচার বিশ্লেষন না করেই তাকে অবজ্ঞা করতে শিখেছে। আর এর ফলেই ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়েছে ধর্ম, শাস্ত্র ইত্যাদির প্রতি মানুষের অণীহা। আর এর জন্যে দায়ী সেই সব পাষন্ড, ধর্মের নামে নিজের স্বার্থসিদ্ধি চরিতার্থ করতে তৎপর লোভী মানুষের দল। এখন আবার নতুন একটি সমস্যা। সব জ্যোতিষীই তবে লোভী বা ভুল? না তাও নয়। অনেক ভালো মানুষ আজও এই পৃথিবীতে আছেন। তা না থাকলে আজও একটি লোক রোদে মাথা ঘুরে পরে গেলে বা ট্রেনে উঠতে গিয়ে পরে গেলে দশজন মানুষ তাকে সাহায্য করতে, তাকে ধরতে ছুটে আসত না।

দেখুন আপনি নিজেকে নাস্তিক মানেন, কিন্তু আপনি কি নিজেকে বিশ্বাস করেননা? করেনতো? তাহলে কিকরে বলেন “আমি ধর্ম মানিনা”? আমাদের ধর্মের তো এটাই শুরু থেকেই শিক্ষা যে নিজেকে চেন। আত্মজ্ঞান না জন্মালে, নিজেকে না চিনলে ধর্ম মানা হয়েনা। তাহলে আপনিতো না জেনেই ধর্ম মেনে বসে আছেন। আচ্ছা, আপনি আপনার গুরুজনদের শ্রদ্ধা করেননা? তাহলে কিকরে বললেন শাস্ত্র মানেন না? শাস্ত্রেতো একথাই লেখা আছে। আপনি কি চান, সমস্ত মানুষ নিজেদের মধ্যে মারামারি করে মরে যাক? এই পৃথিবী শ্মশানপুরিতে পরিনত হোক? নিশ্চয়ই চাননা? তাহলে কিকরে বলেন শাস্ত্র, ধর্ম মানিনা। কারন সেখানেতো পরস্পকে প্রেম ভালোবাসার কথাই বলা হয়েছে বারে বারে। কি, তাও হচ্ছেনা? আসলে তাও মানবেননা কারন আপনার মাথায় তো ঢুকে আছে সেইসব কথাগুলো যা কোন শুভ বিচারের মাধ্যমে বিচার না করে, কিছু ভুল বিচারে আপনার কাছে পৌঁছেছে। ভেবে দেখুন, আপনি হিন্দু ধর্মের নানা গোঁড়ামির কথাই জানলেন আর তা দেখে ভেবে বসলেন যে এই ধর্ম শুধু ভ্রান্ত কিছু ধারনা, গোঁড়ামি আর কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। আসল বিষয়সমুহ জানার প্রয়োজনটুকু ভুলে। কিন্তু ভেবে দেখুনতো আপনি কি গোঁড়া নন? কুসংস্কারী নন? যেখানে আপনি কোন বড়সড় বিজ্ঞানি না হয়েও কিছু বিজ্ঞানের কথা যেনে ধর্মকেই মানতে চাননা, চোখে দেখেননা বলে ভগবানকে মানতে চাননা, আপনি কি গোঁড়ামি করছেননা? আচ্ছা, আপনি মোবাইল ব্যাবহার করেন। আপনাকে যদি বলি আপনার মোবাইলটায় যে তরঙ্গের মাধ্যমে কথাগুলো পৌঁছচ্ছে, আপনি কি আমায় দেখাতে পারবেন? খালি চোখে? কোন যন্ত্র ব্যাবহার ছাড়াই? পারবেন কি? পারবেন না?যাঃ। যা মানুষের তৈরী বস্তু, যার প্রতিটি বিষয় বিজ্ঞানের হস্তগত, তাও আপনি দেখাতে পারছেননা কোন কিছুর সাহায্য ছাড়া খালি চোখে, তাহলে যিনি স্বর্বশক্তিমান, তাঁকে আপনি খালি চোখে দেখতে চান কিভাবে? হ্যাঁ তাও সম্ভব। কিকরে? যেমন আপনি আপনার কোন যন্ত্রের মাধ্যমে আপনার ওই মোবাইলের তরঙ্গ দেখাতে পারবেন ঠিক তেমন করেই। এখানে আপনাকে যে যন্ত্রটি ব্যবহার করতে হবে তার নাম “আধ্যাত্মিকতার জাগরন ও উন্নতি”। আর সেই পথেই আপনি সব প্রশ্নের উত্তর পাবেন, বা যাকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননা, তাঁকে জানতে পারবেন। তখন দেখবেন আপনি যা জানতেন তার থেকে আরোও কত কিছু জানলেন। শুধু কষ্ট করে এই গ্রন্থ পরুন একটি বাজে গল্পের বই পরে সময় নষ্ট করছেন ভেবেই পরুন। ভগবান আপনাকে সুমতি দিন।

যাঁরা আস্তিক, ধর্ম মানেন, কিন্তু মনে অনেক প্রশ্ন, সংশয় তাদের জন্যে

আপনি ভক্তিপরায়ন, ধর্মপরায়ন মানুষ। কিন্তু একি? আপনার তো অনেক বিষয়ই জানা নেই। আপনি কি জানেন আমাদের সনাতন ধর্মও একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী? আমাদের ধর্মেও একজনই ভগবান। যিনিই পরমপুরুষ, পরমাত্মা। এখন আপনার মনে প্রশ্ন এলো তা কি করে হয়? তবে যে আমরা এত দেবদেবীর পূজা করি? বার মাসে তের পার্বন যে লেগেই থাকে। কিকরে একজন ভগবান হয়? দেখেছেন তো। আপনি ভক্তিবান হয়েও এই বিষয়ই এখন অবগত নন। এখন আবার আপনার মনে প্রশ্ন জাগছে, যদি ভগবান একজনই হবেন তাহলে কেউ কৃষ্ণকে তো কেউ কালী কে, কেউ শিবকে তো কেউ গনেশকে পূজা করেন কেন? সবাই বলে “তোমার কর্ম তুমি কর মা”, তাহলে মা-ই যদি সব কর্ম করছেন তবে কর্মফল আমাদের ভোগ করতে হয় কেন? ভগবানই যদি কর্তা হন তবে গীতায় আমাদের কর্ম করার কথা বলে গেলেন কেন? এই ধরনের নানান প্রশ্নে আপনারা জর্জরিত তাইতো। আর এই সব প্রশ্নগুলিই এত মারাত্মক যার উত্তর পেয়ে গেলে আপনি যে ভগবানকে চিনবেন তা হল পরম শান্তির প্রধান উৎস। আমার মুল উদ্দেশ্য আমাদের সনাতন ধর্মের আসল সারটিকে তুলে এনে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। অনেকের মনে এধরনের অনেক বিষয় হাজারও প্রশ্ন থাকলেও তাঁরা হয়েতো কোন মহান ব্যাক্তি বা সতগুরুর সান্যিধ্য পাওয়ার সুযোগ পাননা। কিম্বা হয়েতো কোন শাস্ত্র গ্রন্থ পরে বিষয়গুলিকে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে ভাষার কঠিনতা ও সাধারন মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহার হয়েনা সে ধরনের উন্নত ভাষার ব্যাবহারের কারনে অনেকের কাছে সেই সব গ্রন্থের আভ্যন্তরীণ অর্থ সম্পূর্নরূপে গ্রহন করা সম্ভব হয়েনা। ভগবানের পরম ইচ্ছায় আমি তাই সচেষ্ট হয়েছি সেইসব জ্ঞানপিপাসু মানুষদের কাছে সহজ সরল ভাবে আমাদের মহান ধর্মের মুল সার বস্তুটিকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে। যাতে তারপর তারা সেই শাস্ত্র গ্রন্থ পরে সহজে বিষয়গুলি অনুধাবন করবার মত সামর্থ পেতে পারেন। এই আমার ইচ্ছা। ভগবান আমার সহায় হোন যাতে এই কাজে সফলতা পেতে পারি। এই গ্রন্থ পরে আপনাদের কোন প্রকারের আত্মোজ্ঞান বৃদ্ধি হলে, আত্মোন্নতি হলে অথবা আধ্যাত্মিক চেতনার বৃদ্ধি হলেই আমার কাজ সার্থক মনে করব। ভগবান সকলের মঙ্গল করুন।

সকলের জন্যে

শাস্ত্রের কথা লিখবার আমি কে? আমি নিজে কতটুকু শাস্ত্র জানি? বা জানতে পেরেছি যে আমি তা নিয়ে আলোচনা করব? কথাটা সত্যি বটে। তবে ভগবানের কৃপায় সব হয়ে এটা আমি মানি। আর আমি শাস্ত্র নিয়ে কোনরূপ আলোচনা করতেও বসিনি বা শাস্ত্র নিয়ে লেখা তো দুরঅস্ত। তবে? এ যুগ বিজ্ঞানের বিপুল অগ্রগতির যুগ। যেসকল মানুষ এযুগে শাস্ত্র জানেন এবং মানেন বা পালনও করেন তাদের আমি আর কি শাস্ত্র জ্ঞান দেব? যেখানে আমি নিজে বা কতটুকু জেনেছি? তাই তাঁদের আমার সে জ্ঞান দেওয়ার কোন অধিকারই নেই। কিন্তু বিজ্ঞান মনষ্ক আজকের প্রজন্ম বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমি শুধু জানাতে চাই যে আমাদের ধর্ম ও শাস্ত্রে কি মহান বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে। তাই তথাকথিত শাস্ত্র না লিখে আমি লিখতে চলেছি বিজ্ঞান্মুখি শাস্ত্রের ব্যখ্যা। যা আমাদের ধর্মের মুল শক্তি, মূল জ্ঞানের ব্যখ্যা দিতে পারবে সেইসব বিজ্ঞানমুখি মানুষদের যারা আমাদের শাস্ত্রের কথায় ভন্ডামি, গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং তৎসহ দেবদেবীদের প্রতি কিছু কাহিনী জেনে দ্বিমতও প্রকাশ করে থাকে যে তারা যদি এই কাজ করেন তো আমরা কেন করলে দোষ। তাই আমি একেবারে সাধারন সেইসব ছেলেমেয়ে ও মানুষদের কথা ভেবেই এই গ্রন্থ লিখছি। কারন তারাই আমাদের ভবিষ্যত। এই ভবিষ্যতকে, তার ভীতকে শক্ত করতে গেলে তাদের অবষ্যই আমাদের ধর্মের মুল কথা ও তৎসহ মহান বিজ্ঞানের কথা জানান প্রয়োজন বলেই আমার ধারনা। আমাদের ধর্মের সম্পর্কে জানার স্তর নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমি অনেকগুলি ভাগ পেয়েছি। যেমন একেবারে শুরুতে এমন অনেকে আছেন যাঁরা এটাও জানেন না যে আমাদের ধর্মেও একটিই ভগবান। তিনি পরমেশ্বর। তিনিই ব্রহ্ম। তাঁরা একথা শুনেছেন যে আমাদের ধর্মে নাকি তেত্রিশ কোটি দেবতা। আবার একটি প্রশ্ন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের মাথায় আসে ও খটকা লাগে যে আমাদের ধর্মে এত দেবদেবী কেন? তবে কার পূজো করা বেশি শ্রেয়? তাদের কি বলি? এই অবস্থায় ভেবে দেখুন যদি তাদের বোঝাতে যাই পরমেশ্বরের কথা, তারা কিভাবে বুঝবেন। তখনি হয় গন্ডোগল। সবকিছু গুলিয়ে গিয়ে ভক্তিটাই চলে যায়। তার চেয়ে বরং ধীরে ধীরে এগোনই ভালো। তাদের জন্যে বলি, আমাদের ধর্মেও একটিই ভগবান। তিনিই নানা রূপে নানা সময় নানা কার্য করেন। ঠিক যেমন বিদ্যুৎ। একই স্থান দিয়ে বাড়িতে এসে নানা কাজে লাগে। কখন পাখা, কখন আলো আবার কখন টিভি ইত্যাদিতে। আমাদের শাস্ত্রকারগন আমাদের এযুগের মানুষদের থেকে বহুগুনে উন্নত মস্তিষ্কসম্পন্ন ছিলেন। তাঁদের চিন্তা ও কল্পনা ও ব্যখ্যাশক্তিও ছিল অসাধারন। তাই তাঁরা বিভিন্ন রূপকের মাধ্যমে সমস্ত ধর্মকে ব্যখ্যা করেছিলেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণ মহাত্মা ছিলেন। তিনি তাঁর কথাবার্তার মাঝে ও তত্তকথা বোঝাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নানা উপমা দিতেন? কেন জানেন? কারন একমাত্র এতেই সহজে ধর্মকে বোঝা যায়। আর ঠিক তেমনই সেই যুগের মুনি ঋষিরা নানান উপমার ব্যবহারে ধর্মকথা শাস্ত্রে লিখে গেছেন। কিন্তু এটা মন থেকে মানুন যে তা কিন্তু সবটাই মানুষের উপকারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এইক্ষনে হয়েতো মন থেকে মানতে পারছেন না। আমার গ্রন্থের পরবর্তি অংশগুলি পরতে থাকুন। আপনারাও তা উপলোব্ধি করতে পারবেন। আমার এই ভারত প্রেমের দেশ। এখানে ভালোবাসা সবথেকে ওপরে। তাই হে ভারতবাসী, আজ আমাদের একজোট হয়ে জাগতে হবে। সমস্ত ভন্ডদের মাধ্যমে তাদের লোভ চরিতার্থের কারনে আমাদের এই মহান ধর্মকে আমরা খারাপ হতে, কলুষিত হতে দেবনা। সমস্ত অন্ধ কুসংস্কারকে ধুয়ে ফেলে শুধু ধর্মের মুল সারটুকু তুলে এনে সমগ্র সমাজকে সেই সারের সুধারসে ভাসিয়ে দিতে চাই। তবেই এই সমাজের কল্যান। মানবকল্যানে বোধকরি এর চেয়ে ভালো কাজ আর কিছু হতে পারেনা।

কিন্তু আমরা জানব কিকরে কে ঠিক আর কে ভুল? প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ। ভগবানের সর্বচ্চ সৃষ্টি আমরা। অর্থাৎ মানুষ। ভগবান আমাদের মধ্যে এমন একটি জিনিস দিয়েছেন যার থেকে দামি কিছু বোধহয় কিছু হয়ে না। আর তা হোল মানুষের মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্ককে সঠিক ভাবে কাজে লাগিয়েই আমরা পেতে পারি সত্যের সন্ধান। তবে তার জন্যে চাই সত্যের জ্ঞান, সেই জ্ঞান কিভাবে হতে পারে আসুন সরল ভাবে কিছুটা আলোচনা করা যাক।

আমি পন্ডিত ব্যাক্তি নই। আমি পন্ডিতদের জন্যেও লিখি না। আমি সাধারন, তাই লিখিও সাধারনদের জন্যেই। তাই আমি অনেক সাধারন উদাহরনের মাধ্যম দিয়ে সব ব্যাপার গুলিকে বোঝানোর চেষ্টা করি মাত্র। কিন্তু প্রশ্ন হল সেই উদাহরন যা আমি দি তা যখন কেই পড়ে, তারকাছে তা গ্রহনযোগ্য মনে হয়, হয়েতো বা হয়েনা, কেন এই বিভেদ। বা কখন তা সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য হবে? কখন হবেনা। সেটাই বা জানি কিকরে? এবারে আমি এই সূত্র ধরেই সরাসরি আলোচনার বিষয়বস্তুর কেন্দ্রে প্রবেশ করছি।

ধরাযাক ১০০ জন মানুষকে একসাথে দাঁড় করিয়ে প্রচন্ড গরমের মধ্যে কনকনে ঠান্ডা একটি করে আইসক্রিম হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করা হল এটি ঠান্ডা না গরম? তারা কি উত্তর দেবে বলে আপনার মনে হয়? যদি সকলেই সুস্থ মস্তিকের মানুষ হয় বা মিথ্যা না বলে তাহলে সকলেই আশা করা যায় যে বলবে “ঠান্ডা”। তাইতো? কিন্তু আবার তাদেরই যদি একে একে জিজ্ঞেস করতে শুরু করা হয় যে তাদের প্রত্যেকে পছন্দের রঙ কি কি, তারা দেখবেন হয়েত প্রত্যেকে কখনই একটি রঙই সবার পছন্দ তা বলবেন না। এর কারন কি? এর কারন অনুভুতি। অর্থাৎ অনুভুতির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানকে বলা যেতে পারে “অবিসংবাদী সত্য” (Universal Truth) । তাই মানুষ যে দলেরই হোক না কেন, যে দেশেরই হোক না কেন তাদের কাছে এই অনুভুতির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান সর্বদাই একই হবে। পৃথক হবেনা। তাই সূর্য উঠলে দিন হয় আবার অস্ত গেলে রাত হয় ইত্যাদি সারা দুনিয়ার লোক মানবে। কিন্তু লক্ষ করুন এই ধরনের মানার বা “অবিসংবাদী সত্য” এর সংখ্যা কিন্তু অনেকই কম। আর তার কারন হোল অনুভুতির অভাব। আর এই কারনেই মানুষের নানা ধরনের বিচার বুদ্ধির কারনে মানুষের মধ্যে আজ এত দন্ধ এত মারামারি। কিন্তু প্রকৃতির এই অপুর্ব মায়ায় সৃষ্ট এই বিষয়টিকে কেউই হাত করতে পারবে না যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের একই ধরনের চিন্তা হবে। আর তা উচিতও নয়। কারন তাহলে সৃষ্টিই আর হবেনা। কারন ভাবুন সবাই যদি বলে মিষ্টি ভালোবাসিনা তাহলে মিষ্টির দোকান চলবে কিকরে? সবাই যদি বলে রাস্তার খাবার খাবোনা তবে সেই লোকগুলির পেট চলবে কিকরে যারা রাস্তার ধারে খাবার বিক্রয়ের মাধ্যমে সংসার প্রতিপালন করেন? তবে কি দাঁড়াল? দাঁড়াল এই, যে, আমরা অযথা এইসব বিষয়গুলোতে মানুষের একই অনুভুতি বা একই চিন্তার জাগোরনের কথা বলছিনা। আমি বলছি আধ্যাত্মিক অনুভুতির কথা। সেই চেতনার কথা, যা জাগ্রত হলে সবার কাছেই সেই অনুভূতি একই হবে। সবাই একই কথা বলবে যে ঈশ্বর সুন্দর। এই অনুভুতি অপার তৃপ্তিদায়ক এ বিষয় কারর মনেই কোন সন্দেহ থাকবেনা। তাই আমার উদ্দেশ্য কোনভাবে এই অনুভুতির জাগোরন। আর সেই অনুভুতি একবার জাগলে, একবার মায়ের কৃপা পেলে আর কোন দন্ধ থাকেনা। সকল অন্ধকার কেটে যায়। তখন জ্ঞানালোকে মানুষ শুধু সত্যিটাকেই দেখে। আসুন এবার সেই কাজ কিকোরে সম্ভব একটু ভেবে দেখি।

একজন আমার কাছে বেশকয়েকদিন আগে বেশ কিছু বিষয় তর্ক তুলেছিল। সে নিজেকে আমার কাছে খুব গর্বের সাথে পরিচয় দিয়েছিল “আমি নাস্তিক” বলে। তাতে তার খুব গর্ব একথা বুঝেছিলাম। এখন তার কিছু প্রশ্ন ও আমার কিছু উত্তর দিলাম। আবার স্মরন করাই আমি অতি সাধারন, তাই কোন ভারি ভারি তত্ত কথা তাকে আমি বলতে পারিনি। আমি সহজভাবেই তাকে উত্তর দিয়েছিলাম। একখানি প্রশ্ন ও উত্তর আলোচনার প্রয়োজনে এখানে তুলে ধরছিঃ

প্রথম প্রশ্নঃ আমাদের হিন্দুধর্মে শুরু থেকেই স্ববিরোধিতা। কেউ বলে কালী আসল, কেউ বলে কৃষ্ণ, কেউ বলে শিব। একেকটি পুরানে একএকজনকে বড় ও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। তবে আসল কে? বড় কে?

আমার উত্তরঃ মনে কর একটি পাওয়ার সাপ্লাই ইউনিট আছে যেখান থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়। এখন সেই বিদ্যুৎ তোমার বাড়িতে একটি মেন পয়েন্ট থেকে এসে বাড়িতে পাখা চালাও, আলো জ্বালাও। এবার বল পাখার কারেন্টটা বড়? নাকি আলোরটা? কোনটা আসল?

সে বলেঃ একই যায়গা থেকে আসছে সবকটি একই হবে। আলাদা আলাদা জিনিস যাযা চলছে তাদের ক্ষমতা অনুযাই আলাদা। কিন্তু বিদ্যুৎ একি আসছে।

আমি বলিঃ এই আমাদের ধর্মের আসল কথা। গোড়ার কথা। ঈশ্বর এক। একটাই শক্তি। একটাই উৎস। কিন্তু তার বিভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ। কখন আলো জ্বালাতে চাও তো কখন জল গরম করতে চাও। তেমনি কখনো মা কালী রূপে বা শিব রূপে ধ্বংস করেন, কখনো বা বিষ্ণুরূপে পালন করেন। ব্রম্মারূপে সৃষ্টি করেন। ইত্যাদি। কিন্তু উৎস এক। সেই পরব্রম্ম পরমাত্মা।

সে মেনেছিল এই সহজ উত্তরে তার বোঝার সুবিধা হয়েছে। আগে অনেক যায়গায় সে এর উতর খুঁজেছে, পেয়েওছে, কিন্তু বোধগম্য হয়েনি। ঠিক এই কারনেই আমি এই লেখা শুরু করি। আমার একটি ধারনা আছে। কতটা সঠিক জানিনা। তাও বলি। এই তত্ত কথা দিয়ে যেখানে যে বইতে লেখা থাকে সেই বইগুলি যারা পরেন তারাও জ্ঞানি। কিন্তু যারা কিছুই জানেন না তারা এই বইএর লেখা কি বুঝবেন? মায়ের স্বরূপ বর্ননা করতে গিয়ে যে মহান ভাষার ব্যাবহার দেখি চন্ডী ইত্যাদি গ্রন্থে তা কি এই যুগের সাধারন মানুষের বা সেই মহা জ্ঞানালোকের ছোঁয়া না পাওয়া মানুষের সম্পুর্ন রূপে বোধগম্য হওয়া সম্ভব? আমার ধারনায়, এই যুগে এমন গ্রন্থ রচনা করতে হবে, যা ঘরে ঘরে খেটে খাওয়া তত্তজ্ঞানশূন্য মানুষকেও সরল ভাষায় দেখাতে পারে সেই মহাজ্ঞানের পথের আলো। আমাদের মহান ধর্মের সর্বরস সংগ্রহ করে মূল রসটিকে বের করে এনে, সমস্ত দন্ধকে ছেঁটে ফেলে রচনা করতে হবে এমন এক গ্রন্থ যা পড়লে মানুষের মনে কালী কৃষ্ণের ভেদভাব চলে গিয়ে চারিদিকে দেখবে একটাই আলো আর যে আলোর থেকে একি সাথে একি শরীরে বেড়িয়ে এসে সামনে দাঁড়াবেন কালী ও কৃষ্ণ। তখন এই প্রতিভাত হবে যে এরা পৃথক সত্তা নন। এরা এক। এবং নিজেও এদের থেকে পৃথক নন। নিযেও এঁরই অংশ। এই বৈদান্তিক সত্যকে সরল ভাষায় পৌঁছবার দায়িত্ব আমি পেয়েছি তাঁরই নির্দেশে। তাঁরই আদেশে। সেই মহান পরমেশ্বর এই কাজে আমাকে এগিয়ে নিয়ে যান তাঁর পরম কৃপায় এই কামনা তাঁর শ্রী চরনে। আর কিছু চাই না। এই কার্যের মাধ্যমে সমাজের কল্যান করে এ জীবনকে সার্থক করতে চাই। যাতে তাঁর সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বলতে পারি। “ওগো প্রিয়, আমি তোমার সৃষ্টির মান রেখেছি গো। এস, আমায় তোমার চরণে আশ্রয় দাও”।

প্রথম অংশ

সত্যকে জানা বা তাকে জানার চেষ্টা করা প্রত্যেকটি মানুষেরই উচিত। কারন সত্যই শিব। আর শিবই সুন্দর। “সত্যম শিবম সুন্দরম”। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত সেই সত্য যা সুন্দর তাকে জানার চেষ্টায় নিজেকে নিযুক্ত করা। তাতে একাধারে যেমন নিজের উন্নতি তেমনই উন্নতি সমাজের। কারন মানুষ সামাজিক জীব। মানুষের নিজের উন্নতি হলেই সমাজেরও কল্যান ও উন্নতি হতে বাধ্য। এখন তাই আমাদের উচিত সমাজের প্রতিটি মানুষকে সঠিক জ্ঞান দ্বারা উন্নত করে সমাজসংস্কার করা। ধর্মই হল পরম জ্ঞান। পরম সত্য। আমরা যদি মনে করি এই পৃথিবীতে একমাত্র আমাদের শাস্ত্রই সত্য অন্য সব ধর্মের ধর্মগ্রন্থ মিথ্যা বা ভুল তা সত্য নয়। বরং আমাদের এটাই জানা উচিত যে আমাদের শাস্ত্র যতদুর সুবিস্তৃত তা পৃথিবীর ওপর কোন ধর্মে নেই। হিন্দু ধর্ম কত বর ধর্ম আর তা কত মহত তা এই নিচের শ্লোক টি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যেখানে হিন্দু ধর্ম এমন একটি ধর্ম যা ওপর কোন ধর্ম কে ঘৃনা করার পরিবর্তে সকল ধর্ম কে ভক্তি ও ভালবাসতে অনুপ্রানিত করে:

ধর্ম্মং যো বাধতে ধর্ম্মো ন স ধর্ম্মঃ কুধর্ম্ম তৎ ।

[অবিরোধাত্তু যো ধর্ম্মঃ স ধর্ম্মঃ সত্যবিক্রম]।। বন ১৩১।১১

যে ধর্ম অন্য ধর্মের বিরোধী, তা কখনো ধর্ম নয়, তা কুকর্ম, পরস্পর অবিরোধী ধর্মই প্রকৃত ধর্ম।

আমার মতে কোন একটি বিশেষ মানুষ বা দল বা গোষ্ঠির কিছু সুন্দর কাজের মাধ্যমে সমাজের কিছু অংশের উন্নতি সাধন সম্ভব। কিন্তু সম্পুর্ণ উন্নতি নয়। তার জন্যে একমাত্র প্রয়োজন সবাইকে উন্নত করা। শিক্ষিত করা। শিক্ষিত মানে এই নয় যে লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত। কারন আজকাল এমন অনেকই তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ অশিক্ষিতের মতই আচরন করে। তাই পুঁথগত শিক্ষায় শিক্ষিত নয়, সেটাতো লাগবেই, তাছাড়া আত্মোন্নতি ও সত্যকে সঠিক ভাবে জেনে যে শিক্ষিত আমি তার কথাই বলছি। এবার প্রশ্ন হল এই শিক্ষা কিভাবে কোথা থেকে কি বিষয় এবং কি উপায় পাওয়া সম্ভব। আসুন সেই পথটিই প্রথমে খোঁজার চেষ্টা করি। শূন্য থেকে শুরু করি।

এই মহাবিশ্ব একটা বিপুল শক্তির ভান্ডার। একথা আজ বিজ্ঞানে প্রমানিত। এইক্ষনে এও প্রমানিত শক্তির সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই। তা এক শক্তি থেকে অন্য শক্তিতে পরিবর্তিত হতে পারে। এই পৃথিবী, চন্দ্র সূর্য, আরও কোটি কোটি গ্রহ নক্ষত্র সবইযে শক্তি থেকে সৃষ্টি একথা বিজ্ঞানে প্রমানিত। এই শক্তি (Energy) হলেন সেই মা আদ্যাশক্তি। তাই এনাকে আদি শক্তি বলা হয়। এই শক্তি সর্বত্র অবস্থিত। আমার শরীরে, আপনার শরীরে, এমনকি প্রত্যেকটি অনু পরমানুতে। আর এই কারনেই বলা হয় মা সর্বত্র বিরাজমানা। আমাদের সকলের মধ্যেই ভগবানের বাস একথার অর্থ এই যে সেই আদি শক্তির অংশ আমাদের সকলের মধ্যেই রয়েছে। যা সুর্যে, চন্দ্রে, পৃথিবীতে, মহাবিশ্বে রয়েছে, তাই আমাদের শরীরেও রয়েছে। তাই বলা হয়ে আমরা সকলেই এক। শক্তি সবস্থানে একই রূপে থাকেনা। শক্তির রূপ পরিবর্তন হয়। আকারে ভেদ হয়। আর এই কারনেই শক্তিতে কখনও মা কালী, কখনো মা দূর্গার রূপ কল্পনা করা হয়েছে। এখন এই শক্তি রয়েছে কোথায়? রয়েছে প্রকান্ড মহাবিশ্বে। ব্রহ্মাণ্ডে। এই ব্রহ্মান্ডই হল পরমেশ্বর পরমাত্মা। ভালোকরে লক্ষ করুন, পরমাত্মার মধ্যেই এই শক্তি। অর্থাৎ এঁরাও পৃথক নন। তাই বলা হয় অর্ধনারীশ্বর। এই শক্তিই প্রকৃতি। আর এই প্রকৃতি থেকেই আমাদের সৃষ্টি তাই বলা হয় আমরা সকলেই মায়ের সন্তান।”শ্রী শ্রী চন্ডী” গ্রন্থের “নমো দেব্য়ৈ মহাদেব্য়ৈ শিবায়ৈ সততং নমঃ| নমঃ প্রকৃত্য়ৈ ভদ্রায়ৈ নিয়তাঃ প্রণতাঃ স্মতাং ” মন্ত্র স্মরন করুন যেখানে “নমঃ প্রকৃত্য়ৈ” মন্ত্রে যথার্থই উল্লেখ রয়েছে যে মা-ই হলেন প্রকৃতি। প্রকৃতির মাঝে জল, বায়ু ইত্যাদি সব কিছুই মায়ের মধ্যেই অবস্থিত। তাই বলা হয় বিশ্বের সমস্ত স্থানে তিনি অবস্থিতা। তাঁরই সকল শক্তিকে নানা সময়, নানারূপে ও ব্যাবহারিক কারনের পার্থক্যে নানা দেবদেবীর কল্পনা করা হয়েছে। এই কারনেই তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর উৎপত্তির কারন। আসলে সবই সেই মা। তাঁরই নানা শক্তির নানা রূপ। এই ব্যপারটি পরিষ্কার হলেই সব দ্বন্দ কেটে যায়।

অর্থাৎ যিনি কার্য্য করছেন বা করাচ্ছেন তিনি সেই পরমপুরুষ আর যে শক্তির মাধম্যে সেই কার্য সম্পাদিত করছেন তাই শক্তি। বা প্রকৃতি। তাই উভয়েই এক। একে ছাড়া অপরে কিছু করা সম্ভব নয়। এই হল একেশ্বরবাদের মূল কথা। এইক্ষনে আমি আলোচনা করব কিরূপে শাস্ত্রকারগন এই ব্যাপারটিকেই রূপকের মাধ্যমে শাস্ত্রে এনেছেন, মায়ের এই নানা শক্তিকে কিরূপে তাঁরা রূপকের দ্বারা বর্ননা করেছেন।

প্রাচীন যুগে শূন্য তত্ত্ব অতি উত্তম ছিল। আজকের মানুষ ভাবে তারাই হয়েতো মহাবিশ্বের নানা রহস্য আবিষ্কার করতে পেরেছেন। কিন্তু সেযুগের লেখা পড়লে তারা হয়েতো লজ্জিত হবেন যে আমাদের শাস্ত্রে সেসব কথা বহু বহু যুগ পুর্বেই লিখিত হয়েছিল। কিরূপে? দেখুন। মহাবিশ্ব অনন্ত। যে আকাশ আমরা মাথার ওপরে দেখি তা যতই দিক চক্রবালে গিয়ে মিশে যাক না কেন তা যে এতেই সীমাবদ্ধ নয় তা কেমন জানতেন তখনকার মুনি ঋষিরা। সে কারনেই আকাশের নাম দিলেন “অনন্ত”। অনন্ত এই শূন্যের নামই অনন্ত দেব। পুরানে আছে অনন্ত নাগের ওপরে নাকি ব্রহ্মান্ড অবস্থিত। এর রূপকার্থ এই যে এই মহাবিশ্ব অনন্তে বা মহাশূন্যে অবস্থিত। আবার অন্তবৎ শূন্য হলেন কশ্যপ। আবার এই কশ্যপের সন্তান হলেন সূর্য্য, অর্থাৎ কত সুন্দর রূপকের মাধ্যমে বোঝালেন যে অন্তবৎ শূন্যের মাঝে সূর্য্য অবস্থিত এবং সৃষ্ট। অর্থাৎ সৌরমন্ডলটিকেই বলা হয়েছে কশ্যপ মুনি। অর্থাৎ সমগ্র মহাশূন্য হলেন অনন্ত দেব, শুধুমাত্র সৌরমন্ডলটি হলেন কশ্যপ। এবার ইন্দ্রতত্ত্ব বলছি। ইনি কশ্যপ অপেক্ষাও পরিমিত শূন্য। আমাদের মাথার ওপরে যে আকাশ দেখি ইনি তাই। সেইটুকু শূন্য হলেন ইন্দ্র। কিভাবে বুঝব বিষয়টি সঠিক বললাম? বলা হয়েছে আঁর চক্ষু একসহস্র তারা। আমরা খালি চোখে আমাদের মাথার ওপর সম সংখ্যক তারাই দেখতে পাই। শুধু এটাই নয়। আরও কারন রয়েছে। ইন্দ্রের অস্ত্র ও বাহন যথাক্রমে বজ্র ও ঐরাবত। ঐরাবত সাদা, যা শ্বেত ধ্ববল মেঘের প্রতিক। ইন্দ্রের আরেকনাম মেঘবাহন। অর্থাৎ মেঘ বাহন যার। এর থেকেও বোঝা যায় যে ঐরাবত মেঘেরই রূপক। ইরা শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ ইরাবত বা জলবৎ অর্থাৎ জলযুক্ত কোন পদার্থ অর্থাৎ মেঘ। ইন্দ্রের অস্ত্র বজ্র যে বাজের প্রতিক তা বোধকরি বোঝানোর অপেক্ষা রাখেনা। এবার একটা রূপক কাহিনী দেখুন। ইন্দ্র একবার বৃত্র নামে এক অসুরকে হত করেন। তাই তার আরেক নাম বৃত্রহর হয়। শুনেছিলাম বিদেশে আমাদের ধর্ম ও আমাদের শাস্ত্র নিয়ে অনেক গবেষনা হয়েছে এবং হয়ে চলেছে। যেখানে আমাদের দেশে তার কদর কমছে সেখানে বিদেশের বুদ্ধিমান মানুষদের কাছে এটা বুঝতে দেরি হয়েনি যে আমাদের শাস্ত্রে অনেক কিছু আছে। তাই তা নিয়ে তারা গবেষনা করছেন এবং যার ফল অনেকটাই আমাদের মতন জ্ঞানসন্ধানীরা পাচ্ছি। তার থেকেই এই রূপকটি জানতে পারি আমি। মহাবিদ্যান ম্যাক্সমুলার, যিনি বেদকে ইংরাজীতে অনুবাদ করেছিলেন প্রথম তিনি এই রূপকটি উদ্ধার করেছেন। তাঁর কথায় মেঘ থেকে যখন বৃষ্টি পরার পথে কোন প্রতিবন্ধক এসে গিয়ে বৃষ্টি হয়েনা তখন সেই অবস্থাকেই বলা হয়েছে বৃত্র। আর তখন বজ্রপাতের মাধ্যমে আবার সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি হলে তখন বলা হচ্ছে বৃত্রকে নাশ করেছেন। ভেবে দেখুন, এই কারনে লক্ষ করবেন যখন বৃষ্টির রেশ কমে আসে তখন বাজ পরলে আরো জোরে বৃষ্টি এসে যায়। আর ঠিক এই কারনেই কোন যায়গায় বৃষ্টি নাহলে মানুষে এখনো ইন্দ্রদেবের পূজা করেন। এই আলোচনায় বোঝা যাচ্ছে এই পূজা যথার্থ। কিন্তু ততসহ এটাও ঠিক যে তা বলে সেই পূজায় কোনরূপ কুসংস্কার বা ভীতি ইত্যাদি কোনকিছুই ঠিক নয়। পূজা যথার্থ বললাম এই কারনেই যে, যে শক্তি আমাদের বৃষ্টি দিয়ে মানুষকে প্রানে বাচাচ্ছে, ফসল হতে সাহায্য করছে, গরমের হাত থেকে রেহাই দিচ্ছে, তাকে যদি আমরা সন্মান করি তাতে ক্ষতি কিসের? আমাদের কি সামর্থ আছে যে যদি ক্ষরা হয় বা অনাবৃষ্টির কারনে ফসল না ফলে তাহলে সেই বৃষ্টি নামিয়ে এনে ক্ষরা মুক্তি ঘটান? যখন সেই ক্ষমতা নেই তখন সেই শক্তির কাছে মাথা নত করতে ক্ষতি কিসের? এইভাবে প্রতি ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে আমি চাই আমাদের ধর্মের মূল ব্যখ্যা তুলে ধরে কুসংস্কারের অন্ধকারটি দূরে সরিয়ে দিতে। যাতে যারা ইন্দ্রকে পূজা করতেন তারাও তাদের পূজা বজায় রাখেন কিন্তু সাথে কোন কুসংস্কারে বিশ্বাসী হলে তা দূরে সরিয়ে দেন এবং আরেকদিকে যারা ইন্দ্রকে মানেন না তারাও বোঝেন যে ইন্দ্র আসলে কিসের নাম। (অনেক মহামানব ইন্দ্রকে আবার আমাদের ইন্দ্রিয়ও বলে ব্যখ্যা করেছেন। সেকথা নাহয় পরে আসা যাবে। যেহেতু মা অর্থাৎ প্রকৃতি শক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে তাই আলোচনার তাল নষ্ট হওয়ার কারনে সেই আলোচনায় গেলাম না। )তখন দুপক্ষেই একটি একমুখিতায় আসতে পারে। এই আমার উদ্দেশ্য।

বলা হয়ে থাকে পরব্রহ্ম নিরাকার। আদ্যাশক্তি মাও নিরাকারা। তাহলে কিকরে এত দেবদেবী, এত অস্ত্রশস্ত্রে বা বিষয় সমুহে সজ্জিতা এবং নানা বাহনে অবস্থিতা? এর কারন বিশ্লেষন করি এবার। ধরুন আপনাকে কেউ দুঃখ কেমন দেখতে তা আঁকতে বলল। আপনি কি আঁকবেন? একজন কাঁদছে। তাইতো? কিন্তু কান্না টাই কি দুঃখ? ভেবে দেখুন তো। কান্না হল দুঃখের কারনে সৃষ্ট ফল। তার অভিব্যাক্তি। কিন্তু দুঃখ অন্তরের অনুভুতি। অনুভুতি অনুভব সাপেক্ষ। এর কোন রূপ নেই। তাই আপনি সেই অনুভুতি আঁকতেও পারবেন না। বরং তার ফলটিকে এঁকে বিষয়টি কি তা বোঝাতে চাইবেন। ঠিক তেমনই আনন্দ অনুভুতির ক্ষেত্রেও হাসির ছবি এঁকে বোঝাতে চাইবেন। ঠিক তেমনই ঈশ্বর নিরাকার, মা নিরাকারা, কিভাবে তাঁর সেই শক্তিকে আপনি আকবেন? তাই নানা রূপ কল্পনা করা হয়েছে তাঁদের শক্তিগুলিকে বোঝানোর উদ্দেশ্যে। এইভাবে ঈশ্বরের ও মাতৃশক্তির কার্য, সময়, স্থান ইত্যাদির পার্থ্যক্যে তাঁর নানা রূপের বর্ননা করা হয়েছে। এখন দেখুন এই কারনেই বলা হয়ে থাকে আপনি যাঁরই পূজা করুননা কেন, পূজা তিনিই পাচ্ছেন। এখন আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মতন। মানুষ যেহেতু তিনটি পৃথক গুনের সংমিশ্রনে সৃষ্ট তাই তাদের হেরফেরে মানুষের স্বভাবের, ইচ্ছারও হেরফের হয়। এটাই স্বাভাবিক। তাই সকলের পছন্দ বা চাহিদা ইত্যাদি সমান হয়েনা। আর ঠিক এই কারনেই নানা মানুষের ইষ্টদেবতা বা আরাধ্য দেবতার মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। আর সে কারনেই, এই চিন্তার বা ইচ্ছার ভিন্নতার কারনেই এত দেবদেবীর কল্পনা যদিও এরা সকলেই এক। আমাদের শাস্ত্রকারগন মনস্তাত্মীক বিদ্যায় এতটাই পারদর্শী ছিলেন যে এটা জানতেন যে সকলের সব গুন হয়েত পছন্দ হবেনা। যেমন হয়েত বৈষ্ণবগনের ক্ষেত্রে শ্মশানবাসী হয়ে যেমন তান্ত্রিক জীবনযাপন পছন্দ হয়েনা তেমন তন্ত্রে আবার মাংসাদি খাওয়া বিধিত যা বৈষ্ণবে নেই। এইটাই অনেকের মনে দ্বিধার সৃষ্টি করে ও এই প্রতিভাত হয় তাদের কাছে যে হিন্দুধর্মে অনেক স্ববিরোধিতা আছে। যদিও তা সঠিক নয়। আমার ওপরের আলোচনা থেকেই বুঝতে পারবেন যে তাঁর নানা স্থানের নানা রুপের কল্পনা। যাতে সকলেই, সে যে চাহিদার বা যে গুনেরই মানুষ হোক না কেন, তাঁর আরাধ্যকে ঠিকই পেয়ে যাবেন। এখন এই ব্যপারটিতে ভুল হতে পারে বা গুলিয়ে যেতে পারে যে কখন তাঁরা পুরুষ রূপ ও কখন স্ত্রী রূপ কল্পনা করেছেন। যখন সরাসরি ঈশ্বরের রূপ ভাবা হয়েছে তখন পুরুষ ও যখন সেই পুরুষের ক্রিয়া রূপ বা কার্যশক্তির রূপ কল্পনা করা হয়েছে তখন স্ত্রী রূপ। উদাহরন স্বরূপ ধরুন ইন্দ্র। ভগবানের মেঘ, বজ্র, বৃষ্টি ইত্যাদি সমন্নিত রূপকে যদি ইন্দ্র ভাবা হয়ে থাকে তবে তিনি যে শক্তির মাধ্যমে এই ক্রিয়া করেন অর্থাৎ বজ্রপাত করেন বা বৃষ্টি নামান সেই শক্তির নাম “ঐন্দ্রী”। তাহলে আরেকটি ব্যাপারও পরিষ্কার যে আমরা যদি বজ্র বা বৃষ্টির জন্যেও মায়ের শরনাগত হই, তাঁকে পূজা করি তবে তিনিই ইন্দ্রের শক্তি রূপে আমাদের তা দান করবেন। তাই তাঁকে এও বলা হয়েছে যে তিনিই অন্নপূর্না। অর্থাৎ যিনি আমাদের অন্ন দান করেন। অন্ন শস্য ফলনের জন্যে বৃষ্টি আবশ্যক। তাই নতুন শস্য উঠলেও অনেকে তাঁর পূজা করেন। “নতুন ধান্যে হবে নবান্ন তোমার ভবনে ভবনে”। এই পূজাও যথার্থ। কারন প্রকৃতির ইচ্ছা না হলে, সাহায্য না এলে, শস্য ফলানো আজ অবদিও সম্ভব হয়েনি মানুষের দ্বারা। তাই সেই মহান শক্তির নিকট মাথা নোয়াতে ক্ষতি কি?

অর্থাৎ যেখানে যেদিকে যা কিছু কার্যই হোক না কেন তা সেই মা। তাঁর শক্তি বিনা কিছুই করা সম্ভব নয়। তাই বলেছেন “তোমার কর্ম তুমি কর মা, লোকে বলে করি আমি”। তাহলে কি কর্ম আমি করি না? তবে পাপ পূন্য কেন আমার হবে? এই প্রশ্নও অনেকের মনে আসে যে যদি তিনিই সব করেন তাহলে পাপের ভাগি আমরা কেন? এর কারন কর্ম আমিই করছি। কিন্তু যে শক্তিতে করছি তা মাতৃ শক্তি। মায়ের শতিতে বলিয়ান হয়ে আমি ভালো করলে অবশ্যই মঙ্গল। আর খারাপ করলে? মায়ের শক্তির ভুল ব্যাবহারে কি পাপ হওয়া স্বাভাবিক নয়?

নাম নিয়ে আরও কিছু আলোচনা করা যাক যার ভেতর থেকে আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর বেড়িয়ে আসবে। আপনি একজন মানুষ। কিন্তু ভেবে দেখুন আপনারই কত রূপ। কিভাবে? আপনি কারও ছেলে। তখন মা বাবার কাছে আপনার একজন সন্তানের রূপ। তখন আপনার এই রূপের ক্রিয়া কি? ভক্তি, শ্রদ্ধা ইত্যাদি। এখন আপনি হয়েত কারও স্বামী। তখন আপনার ক্রিয়া প্রেম, ভালোবাসা, দায়িত্ব ইত্যাদি। আবার আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে আপনার রূপ বাবার ন্যায়। সেই অনুযায়ী আপনার ক্রিয়ারও ভেদ হবে। শুধু এই নয়, আপনার কর্মজগতে, অফিসে, রাস্তাঘাটে, বন্ধুদের কাছে, পাড়ার মানুষদের কাছে ইত্যাদি নানা যায়গায় নানা মানুষের কাছে আপনার নানা রূপ ও ক্রিয়া। এবার ভেবে দেখুন আপনি একজন সাধারন মানুষ হয়েই যদি আপনার এত মানুষের চোখে নানান বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে চরিত্র, ক্রিয়া ইত্যাদির ভেদ দেখা যায়, তবে যিনি সর্বস্ব, সর্বশক্তিমান, যিনি সবার ওপরে, তাঁর নানা রূপ নানা শক্তি কল্পনা কি নিরর্থক? আবার ঠিক একই কারনে একই রূপের আবার বহু নামও আছে। যেমন শ্রীকৃষ্ণের একশত আট নাম ইত্যাদি।

প্রকৃতির যে শক্তিতে দুষ্টের দমন হয়, দুর্গতির বিনাশকারি ঈশ্বরের সেই শক্তির রূপের নাম মা দুর্গা। এখন লক্ষ করুন, প্রকৃতির মাঝে পর্বত সবচেয়ে উচ্চ বস্তু। আর তার মধ্যে ভারতীয়দের কাছে সর্বচ্চ পর্বত হল হিমালয়। আর এই কারনেই সেই প্রকৃতি স্বরূপিনী মা দুর্গার পিতার নাম হিমালয়। কত অপুর্ব এই চিন্তা। যিনি বা যাঁরা এই কল্পনা করেছিলেন। আমরা শ্রী শ্রী চন্ডী থেকে জেনেছি যে মা কালীর উৎপত্তি হয় মা চন্ডীর কপালের তৃতীয় নেত্র থেকে। এই রূপকটির অর্থ নির্নয় করা যাক। মানুষের যখন প্রচন্ড রাগ উৎপন্ন হয় তখন কপালে ভাঁজ পরে। অর্থাৎ ভ্রূকুটি কুটির হয়। তাই এই কপাল থেকে মা কালীর উৎপত্তির মাধ্যমে প্রচন্ড রাগকেই বোঝান হয়েছে। যা প্রচন্ড ধ্বংসের প্রতিক। আর তাই মা কালী মহা প্রলয় বা ধ্বংসের দেবী রূপেই অঙ্কিতা হয়েছেন। এই প্রসঙ্গে আরোও একটি সুন্দর ব্যাখ্যা নিয়ে আসি যা আমার মাথায় যখন এসেছিল আমি নিজেই হতবাক হয়ে গেছিলাম। তা যে মায়ের কৃপাতেই আমার মাথায় এসেছিল তা বুঝতে অসুবধা হয়েনি। আর মা আমার মাথায় এই বিষয়গুলি কেন প্রবেশ করান, তা যে শুধুই মানুষকে জানানর উদ্দেশ্যে সে বিষয়েও আমার মনে কোনপ্রকারের সন্ধেহের অবকাশ নেই। কারন ছাড়া কার্য হয়েনা। তা যদি আবার মায়ের কার্য হয় তবেতো তার কারন আরও ব্যপক এ কথাতো মানবেন। যাই হউক, বিষয়টিতে প্রবেশ করি। যে শক্তিকে বা পরমেশ্বরের যে রূপকে আমরা পূজা করি তার ঠিক সেই প্রকারের পূজার উপচার, স্থান ও নিয়ম নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অনেকের মতে ইহা হয়েতো ভন্ডামি। কিন্তু কেন তা নয়, এবং এইসকল উপচারের কিবা প্রয়োজন তার বিচার করছি। পরমেশ্বর ও তাঁর শক্তি সর্বত্র এতো জানাই হয়েছে। তাই একথা শোনা যায় যে যেকোন স্থানেই তাঁকে পূজা করা যায়। একথা সত্য। কিন্তু সাধারন মানুষ সেই কল্পনা সাধারন ভাবে করতে পারেনা, সেই মূর্তি বা তাঁর অপার শক্তির কল্পনা করতে পারেননা বলেই নানা মুর্তির প্রয়োজন হয়ে থাকে। যেমন আমি আগেই দুঃখ, রাগ, হাসি ইত্যাদি প্রকাশে নানা ধরনের ছবির ব্যাবহারের কথা বলেছি। তাই মন্দির, পূজার আয়োজন ইত্যাদির প্রয়োজনও আছে। ভেবে দেখুন, আপনাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে প্রচুর জানজটের মাঝে যদি কেউ মোবাইলে খুব ভালো কোন সিনেমা দেখায়, আপনার কি ততটা ভালো লাগবে যতটা ভালো লাগবে কোন মাল্টিপ্লেক্স সিনেমাহলে বসে, এসির শিতল হাওয়ায় পপকর্ন খেতে খেতে চিন্তা মুক্ত মাথায় দেখলে? সিনেমা দেখাটিকে এক্ষেত্রে যদি পূজা ধরি তবে সিনেমা হলটি হল মন্দির। পপকর্ন ও এসি হল পূজার সামগ্রী ইত্যাদি। এই কারনেই পূজার আয়োজনে সঠিক স্থানে তা হোলে সমগ্র মনটি তাতে নিবিষ্ট হয়ে যায়। ব্যাতিক্রম শুধু মহাপুরুষগন। তাঁদের কাছে রাস্তাতেও যে ঈশ্বর, মন্দিরেও তাই। কিন্তু সাধারন মানুষের কাছে এই কল্পনা অনেক কঠিন, তাই এই ব্যাবস্থা। এখন প্রশ্ন হল তবে কি স্থান মাহাত্য বলে কিছু নেই? সর্বস্থানে ঈশ্বর রয়েছেন, সর্বস্থানে তাঁকে পূজা করা গেলে বিশেষ বিশেষ স্থানে জ্যোতির্লিঙ্গ, সতীপিঠ ইত্যাদির কি তবে মাহাত্ম নেই? আছে বৈকি। তারও সহজ সরল উদাহরন স্বরূপ ব্যাখ্যা দি এইস্থানে। ধরুন আপনি ডাক্তার। আপনি রুগি চেম্বারে দেখেন, কলে যাননা। আপনার কোন রুগি যদি আপনাকে খুঁজতে অযথা কোন ভুল স্থানে না গিয়ে আপনার চেম্বারে ঠিক সময় আসেন তবে আপনাকে পাওয়ার সুযোগ থাকবে সেতো বলাই বাহুল্য। দেখুন, এখানে সময়েও একটা ব্যাপার। দিন, সময় ইত্যাদি। কারন ডাক্তারের সেই সময়, দিন ইত্যাদি স্থির থাকে। ঠিক এই কারনেই আবার বিশেষ বিশেষ দেবতার পূজারও দিন সময় ইত্যাদিও ঠিক করেছিলেন সেই মহাত্মাগন। যেমন সোমবার শিবের পূজা ইত্যাদি। এই হল স্থান, সময় ইত্যাদির মাহাত্ম। তবুও যাঁরা মহাত্মা, তাঁরা যেকোন সময় যেকোন স্থানেই একই ফল লাভে সমর্থ হন। এরও সরল উদাহরন আছে। আপনার রুগি যদি বিরাট কোন ব্যাক্তিত্য হন তখন আপনি নিজের সময় বা স্থানের বাইরে গিয়েও তাঁকে দেখতে যেতে পারেন। যেমন আপনাকে যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজের চিকিৎসার জন্যে ডেকে পাঠান, হয়েত আপনি সারা দেবেন। ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটে মহাত্মাদের ক্ষেত্রে। তাঁরা তাদের কর্ম দ্বারা এতই ওপরের স্তরে পৌঁছে গেছেন যেখানে ঈশ্বর তাঁদের ডাকে সারা না দিয়ে পারেন না। যেস্থানে যে অবস্থাতেই ডাকুন না কেন। এখন দেখুন ঈশ্বরের শক্তিভেদে ও রূপভেদে আবার স্থান, পূজা ইত্যাদির পদ্ধতি কেমন সুন্দর করে আমাদের পূর্বপুরুষগন সৃষ্টি করে গেছেন। সেই আলোচনা এবারে করা যাক।

মনে করা যাক কৃষ্ণের মূর্তি। তিনি তাঁর বাঁশি হাতে অপুর্ব সুন্দর সুরমাধুরিতে চারিদিকে মুখরিত করছেন। এই পরিবেশে যদি তাঁকে পূজা করা হয়, স্মরন করা হয়, শ্রদ্ধা জানান হয় তবে কেমন পরিবেশ প্রয়োজন? মনরম, সুগন্ধিতে ভরা, আনন্দে উন্মত্ত মনে, সঙ্গীতে বাদ্যে মুখরিত পরিবেশে। তাই নয় কি? আবার অপর দিকে খেয়াল করুন, মা তারা, ঈশ্বরের এই শক্তি রূপটি যে পরিবেশে কল্পনা করা হয়েছে তা শত্রু দমনে সমস্ত শত্রুর মস্তক ছিন্ন করে মা সকলকে রক্ষা করছেন। অর্থাৎ মা কোন স্থানে অবস্থান করছেন? কি রূপে? যেখানে চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে শত্রুদের মৃতদেহ। এখন ভেবে দেখুন প্রচুর মৃতদেহ কোথায় দেখা যায়? শ্মশানে। সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশ, যা ভাবলে মানুষের মন শিউরে ওঠে সেই পরিবেশের উপযুক্ত স্থান শ্মশানই। তাই না? আর তাই মা তারার ধ্যান, চিন্তন  ইত্যাদির ক্ষেত্রে উপযুক্ত স্থান বিহিত হয়েছে শ্মশান। ইহা কি অনুপযুক্ত হয়েছে? তাই যদি হবে তবে কৃষ্ণের ক্ষেত্রেও অনুপযুক্ত হওয়া উচিত? তাই নয় কি? এই কারনেই আমি বলি কৃষ্ণও যিনি কালীও তিনি।

এবারে মহাদেবের রূপকার্থ বর্ননা করছি। প্রলয় কর্তা অর্থে ঈশ্বরের নাম মহেশ্বর। কোন কিছুর সৃষ্টি হলেই ধ্বংস অবশ্যম্ভাবি। কিন্তু এই সৃষ্টি থেকে ধ্বংসের মাঝে কিছু সময় বা কালের ব্যাবধান থাকে। তাই মহাদেবকে একাধারে মহাকালও বলা হয়ে থাকে। আবার যিনি সকল ধ্বংসের কর্তা তাঁর কি নিজের কোন ধ্বংস থাকতে পারে? তাই শিবের আরেক নাম মৃত্যঞ্জয়। যাঁর মৃত্যু নেই। মহাদেবকে আদি দেব বলা হয়। এর তাতপর্য এই যে কাল সবসময় বর্তমান ছিল। যখন কিছুই ছিলনা তখনও কাল ছিল। তাই তিনিই ঈশ্বরের আদি রূপ। তিনিই যেহেতু ঈশ্বরের কালরূপে কল্পিত তাই তিনি সর্বজ্ঞ। কারন সমগ্র কালে তিনি ছিলেন তাই সব কালের কথাই তাঁর অবগত আছে। শিবের শক্তি হলেন মা কালী। তিনি শিবের ওপরে অবস্থিতা। শিব মা কালীর পায়ের নিচে শবরূপে অবস্থিত। “শবরূপ মহাদেব হৃদয়োপরিসংস্থিতাম” (মা কালীর ধ্যান মন্ত্রের অংশ)। এর কি ব্যখ্যা? এর ব্যখ্যা এই যে, যেন কোন মানুষের শরির থেকে শক্তি নির্গত হয়েছে আর তাই শক্তিবিহীন শরীরটি পরে রয়েছে শবরূপে। আর তাঁর সেই শক্তি তাঁর কার্যই সাধন করছেন। অর্থাৎ ধ্বংস কার্য। এই এর রূপকার্থ। ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরানের প্রকৃতি খন্ডেও ঐ কথাই বলা হয়েছে। “শিবশক্তস্তয়া শক্ত্যাশবাকারস্তয়া বিনা”। অর্থাৎ শিব শক্তিসহ থাকলেই শক্তিমান, নয়েত শবাকার হন। শিব শবরূপে শয়ন করে আছেন আর তাঁর শক্তি মা কালী তাঁর ক্রিয়া করছেন তাঁর শরীর থেকে নির্গত হয়ে। তাই শিবও যিনি, কালীও তিনি।

আগে বলেছি কৃষ্ণও যিনি কালীও তিনি, এখন শিবও যিনি কালীও তিনি প্রমান হওয়াতে বোঝা গেল শিব, কালী ও কৃষ্ণে কোনই ভেদ নেই। শুধু আমাদের মনের ভ্রান্ত ধারনায়, বোঝার ভুলে যতসব ভেদের সৃষ্টি হয়।

এবারে বিষ্ণুর রূপ। ঈশ্বরের সৃষ্টি কার্যের রূপই হলেন বিষ্ণু। তাঁর চারটি হাত। দুটি হাতে চক্র ও গদা, যা সৃষ্টি কার্যে বাঁধাদের দূর করার প্রতিক। আর দুহাতে শঙ্খ ও পদ্ম যা যথাক্রমে শত্রু দমনের পর শত্রু বিজয়ের প্রতিক ও শান্তির প্রতিক। কোমলতা ও সুন্দরতার প্রতিক। এবার লক্ষ করার মতন বিষয় হল, এই বিষ্ণুরই অবতার কৃষ্ণের কিন্তু দুটি হাত কল্পনা করা হয়েছে। কারন তিনি শত্রু নিধনে নন, বাঁশি হাতে একজন সুন্দর প্রেমিক রূপেই বেশি করে আমাদের আছে গ্রহনযোগ্য, আর তাঁকে সেইভাবেই কল্পনা করা হয়েছে। এইভাবে সেই মহান পূর্বপুরুষগন তাঁদের মহানুভবতার দ্বারায় নানা দেবদেবীর কল্পনা অতি নিপুন ভাবে করে ছিলেন। (এই স্থানেই একটি কথা বলি যে এইসব দেবদেবীর একএকজনেরই রূপকার্থ বোঝা বা তাকে বিশ্লেষন করার ক্ষমতা আমার নেই, এবং যদি কেউ তা করে থাকেন তবে একটি রূপের ব্যখ্যা দিতে গিয়েই সারা জীবন কেটে যাবে এনাদের রূপকার্থ এতই ব্যপক। তবুও আমার এই গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্যের খাতিরে এইটুকুই ব্যখ্যা দেওয়া উপযুক্ত মনে করি। এক্ষেত্রেও আমার উদাহরন প্রয়োগ করি। যেমন প্রথম শ্রেনীর কোন শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহ সম্পর্কে জানাতে গেলে শুধু তাদের নাম ও সামান্য কিছু বিষয় বলেই ছেড়ে দেওয়া হয়, গ্রহ সম্পর্কিত মহা মহা তথ্য তাদের জানান হয়েনা তারা কিছুই বুঝবেনা সেই কারনে, ঠিক তেমনই আমি নিজে আধ্যত্মিক জগতের একজন নিচু শ্রেনীর ছাত্র (হয়েত বা তাও নই) হয়ে, একজন প্রথম শ্রেনীর মানুষকে জানাতে গেলে এটুকুই ব্যাক্ত করা উপযুক্ত মনে করলাম।)

এইভাবেই যদি বিশ্লেষন করা যায় তবে দেখা যাবে যে আমরা প্রত্যেকটি দেবদেবীরই উৎপত্তির কারন ও মায়ের সেইসব শক্তিগুলির রূপ সম্পর্কে একটি সচ্ছ ধারনা পাব। যদিও তাঁরা সকলেই এক। শ্রী শ্রী সিতারাম দাস ওঙ্কারনাথ ঠাকুর একবার একটি দুর্গা মুর্তি দেখে এই বিষয়টিকেই কত সুন্দর করে বলেছিলেন “তাইত তোমায় চেনবার উপায় নাই, বাঁশি লুকিয়েছো , সে কাল রঙ আর নাই, দু’হাতের স্থানে দশ হাত করেছো, তিনটি নয়ন হয়েছে, পুরুষদেহ ত্যাগ করে রমনী হয়েছো, সবই ছেড়েছো, কিন্তু ত্রিভঙ্গ ঠামটি ত ছারতে পারনি! এইখানে ধরা পড়ে গেছো।” কত সরলভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে মা দূর্গাই শ্রীকৃষ্ণ।

এই সুত্র ধরেই একটা কথা মনে এলো যে বেশ কয়েকবছর আগে আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছিল দুর্গা মূর্তি দেখে যে দুর্গার সাথে চার ছেলে মেয়ের যে কাহিনী রয়েছে লোককথার ন্যায় তার বিষয়টা কি? পরে যখন জেনেছিলাম এঁরা সকলেই এক তখন আরো গুলিয়ে গেছিলো বিষয়টি যে তবে মা দুর্গার একার পুজা কেন করা হয়েনা। চারজনের কি প্রয়োজন। মায়ের দয়ায় তারও উত্তর পেয়ে গেলাম। মা দুর্গা শক্তি জেগেছিল অসুর নিধনে, দুর্গতির বিনাশকার্যের কারনে। কোন দুর্গতির বিনাশ কালে মা শক্তির থেকে দুর্গা নামে যে শক্তির উতপত্তি হয় তা পেলে আর্তিকের ন্যায় দুর্যয়, ভয়হীন, সেনাপতির ন্যায় সৌর্য বীর্য সম্পন্ন মানুষের তুল্য হয়ে যায়, তাই কার্তিকের রূপক সাথে থাকে। মহাশক্তির থেকে বহু সিদ্ধির লাভ হয়ে বলে সিদ্ধিদাতা গনেশের কল্পনা। আবার দুর্গতির নাশ হলে, অশুভ জ্ঞানের অন্ধকার কেটে গেলে শুভ জ্ঞানের আলোকে চারিদিক শ্বেতশুভ্র উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাই মা সরস্বতী দেবীর কল্পনা ও তৎসহ শোভা ও নানা সম্পদের প্রাপ্তির কারনে মা লক্ষী দেবীর কল্পনা বোধহয় যথার্থ। আর সর্বপরি মা দুর্গার মাথার ওপরে ভগবান মহাদেবের থাকার কারন, দুর্গতির বিনাশে, সমস্ত অন্ধকার নাশে, সেই মহান পরমপুরুষ কে আমরা লাভ করতে সমর্থ হতে পারব। তাই উর্গা মুর্তিতে নিচ থেকে উপরিস্থল অবদি শক্তির স্তবন, তার দ্বারা মা দুর্গতি নাশিনী মা শক্তির জাগরন, নানাবিধ কৃপা ও সিদ্ধি লাভ ও সবার ওপরে পরমপুরুষ পরমাত্মাকে লাভ করার ধাপ গুলিকেই একত্র করা হয়েছিল মহান সেই সব পুর্বপুরুষগনের দ্বারা।

এতবধি আলোচনা দ্বারা এই কথাটি তো স্পষ্ট হল যে নামরুপকার্থ কিভাবে পূর্বপুরুষগণ সৃষ্টি করে গেছিলেন। কিন্তু আমি বলছি বলেই যে তা মানতে হবে তা তো নয়, তার জন্যে প্রমানের প্রয়োজন আছে বৈকি। মহানির্বাণ তন্ত্র থেকে এই অংশটি দিলাম :

এবঙ্গুণান্যসারেণ রূপানি বিভিধানিচ

কল্পিতানি হিতার্থায় ভক্তানামল্পমেধসাং।

অর্থাৎ এইরূপ গুনের অনুসারে নানা প্রকার রূপ অল্পবুদ্ধি ভক্তদিগের নিমিত্ত কল্পনা করা হয়েছে

যাই হোক আমার আলোচনা ও রূপ কল্পনা ও তার অর্থ নিয়ে আরো দুচার কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি কারণ সেই বিষয় গুলি ভেবে আমার নিজেরই বড় অবাক লেগেছে। এতক্ষণের আলোচনায় এ বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে ভগবান পরমেশ্বরের নানা কার্যের ক্ষেত্রে পুরুষ রূপ ও তাঁর কার্য করার শক্তিকে স্ত্রী রূপে কল্পনা করা হয়েছে। যদি ভাবি মা সরস্বতী দেবীর কথা। আমাদের যখন সঙ্গীত সাধনার বা বাদ্য সাধনার ইচ্ছা জন্মায় তখন যে শক্তির মাধ্যমে আমরা সেই সাধনা করতে পারি তাই মা সরস্বতী। অধ্যাবসায়ের ক্ষেত্রেও একই কথা। তাই বিদ্যা, সঙ্গীত ইত্যাদির ক্ষেত্রে মা আদ্যাশক্তির সেই সগুণ শক্তির রূপই হলেন মা সরস্বতী। তাই মা সরস্বতীর পূজা বা স্তবন দ্বারা আমরা সেই কর্মগুলি করতে সক্ষম হব এর অর্থ যে আমরা মা অদ্যাশক্তির সেই গুনটিকে পেতে চাই যা মা সরস্বতী রূপে অঙ্কিত হয়েছে।

মা মনসার ব্যপারে ভেবে আমরা আরো অবাক লেগেছে যখন তাঁর বিষয় ভেবে কিছু সূত্র পেতে সক্ষম হয়েছি তাঁর কৃপায়। মা মনসা বিষহরি। সর্পের দেবী রূপে অঙ্কিতা। কিন্তু যদি আমরা একটু অন্য ভাবে ভাবি। আমাদের শরীরে কুণ্ডলিনী বলে একটি সুপ্ত শক্তি বর্তমান রয়েছে তা হয়েত অনেকেই জানি। যারা জানেননা তাদের জন্যে নাহয় পরে কোন এক পরিসরে আলোচনা করা যাবে। সেই কুণ্ডলিনী শক্তিকে অঙ্কিত করা হয়েছে সর্পের রূপে। সেই শক্তি জাগ্রত করার কথা আমরা  পাই নানা তন্ত্রে। যেখানে সেই শক্তিকে পূজা করা ও জাগরিত করার জন্যে পুরুষ রূপে ভগবান শিবকে পূজা করা হয়। এখন মা মনসাকে সর্পের দেবী বলার অর্থ এই নয় তো যে তিনি এই কুলোকুণ্ডলিনীর সাথে কোন ভাবে যুক্তা? আর তাঁকে ভগবান শিবের কন্যাও বলা হয়েছে। তাই শিবের সাথে তাঁর একটি সম্পর্কও রয়েছে। আবার আমাদের শরীরে রয়েছে সাতটি চক্র যা ভবিষ্যতে কুণ্ডলিনী নিয়ে আলোচনা করার পরিসরেই বলার অপেক্ষায় এখানে আর আলোচনা করলাম না। অর্থাৎ এই সাতটি চক্র সেই কুণ্ডলিনীর সাথে যুক্ত। আবার মনসা মঙ্গল কাব্যে দেখানো হয়েছে মা মনসার কোপে চাঁদ সদাগর বনিকের ৭ টি জাহাজই নষ্ট হয়েছিল। সংখ্যাটি অন্য কিছুও হতে পারতো। কিন্তু সেই ৭ ই ধরা হয়েছিল। আবার তাঁর কোপে বনিক সর্বস্ব হারিয়েছিলেন। অর্থাৎ তার মানে কি এমন কিছু দাঁড়ায় না যে এই কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগাতে পারলেই সেই ৭ টি চক্রকে রক্ষা করা সম্ভব? এখানে মা মনসার কোপ অর্থে কুণ্ডলিনী শক্তির অপব্যবহার বা নিঃব্যবহার। আবার সবকিছু হারান অর্থে যে শক্তি একজন মানুষ কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগরিত করলে পেতে পারেন তা না জাগানোর ফলে হারান। এমন চিন্তার আরেকটি কারনও আছে, মনসামঙ্গল কাব্য কিন্তু তন্ত্র আসার পর লেখা হয়েছে।তাই সেক্ষেত্রে এই কুণ্ডলিনী বিষয়টি থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এইভাবে আলোচনা করতে থাকলে পাতার পর পাতা শুধু বিশ্লেষনই চলতে থাকবে।তাই এ বিষয় নিয়ে আর কিছু বলছিনা। ভবিষ্যতে আরো কিছু আলোচনা করার অপেক্ষায় নাম রূপকার্থ এখানেই সমাপ্ত করলাম।

দ্বিতীয় অংশ

নাম নিয়ে আরও কিছু আলোচনা করা যাক যার ভেতর থেকে আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর বেড়িয়ে আসবে। আপনি একজন মানুষ। কিন্তু ভেবে দেখুন আপনারই কত রূপ। কিভাবে? আপনি কারও ছেলে। তখন মা বাবার কাছে আপনার একজন সন্তানের রূপ। তখন আপনার এই রূপের ক্রিয়া কি? ভক্তি, শ্রদ্ধা ইত্যাদি। এখন আপনি হয়েত কারও স্বামী। তখন আপনার ক্রিয়া প্রেম, ভালোবাসা, দায়িত্ব ইত্যাদি। আবার আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে আপনার রূপ বাবার ন্যায়। সেই অনুযায়ী আপনার ক্রিয়ারও ভেদ হবে। শুধু এই নয়, আপনার কর্মজগতে, অফিসে, রাস্তাঘাটে, বন্ধুদের কাছে, পাড়ার মানুষদের কাছে ইত্যাদি নানা যায়গায় নানা মানুষের কাছে আপনার নানা রূপ ও ক্রিয়া। এবার ভেবে দেখুন আপনি একজন সাধারন মানুষ হয়েই যদি আপনার এত মানুষের চোখে নানান বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে চরিত্র, ক্রিয়া ইত্যাদির ভেদ দেখা যায়, তবে যিনি সর্বস্ব, সর্বশক্তিমান, যিনি সবার ওপরে, তাঁর নানা রূপ নানা শক্তি কল্পনা কি নিরর্থক? আবার ঠিক একই কারনে একই রূপের আবার বহু নামও আছে। যেমন শ্রীকৃষ্ণের একশত আট নাম ইত্যাদি।

প্রকৃতির যে শক্তিতে দুষ্টের দমন হয়, দুর্গতির বিনাশকারি ঈশ্বরের সেই শক্তির রূপের নাম মা দুর্গা। এখন লক্ষ করুন, প্রকৃতির মাঝে পর্বত সবচেয়ে উচ্চ বস্তু। আর তার মধ্যে ভারতীয়দের কাছে সর্বচ্চ পর্বত হল হিমালয়। আর এই কারনেই সেই প্রকৃতি স্বরূপিনী মা দুর্গার পিতার নাম হিমালয়। কত অপুর্ব এই চিন্তা। যিনি বা যাঁরা এই কল্পনা করেছিলেন। আমরা শ্রী শ্রী চন্ডী থেকে জেনেছি যে মা কালীর উৎপত্তি হয় মা চন্ডীর কপালের তৃতীয় নেত্র থেকে। এই রূপকটির অর্থ নির্নয় করা যাক। মানুষের যখন প্রচন্ড রাগ উৎপন্ন হয় তখন কপালে ভাঁজ পরে। অর্থাৎ ভ্রূকুটি কুটির হয়। তাই এই কপাল থেকে মা কালীর উৎপত্তির মাধ্যমে প্রচন্ড রাগকেই বোঝান হয়েছে। যা প্রচন্ড ধ্বংসের প্রতিক। আর তাই মা কালী মহা প্রলয় বা ধ্বংসের দেবী রূপেই অঙ্কিতা হয়েছেন। এই প্রসঙ্গে আরোও একটি সুন্দর ব্যাখ্যা নিয়ে আসি যা আমার মাথায় যখন এসেছিল আমি নিজেই হতবাক হয়ে গেছিলাম। তা যে মায়ের কৃপাতেই আমার মাথায় এসেছিল তা বুঝতে অসুবধা হয়েনি। আর মা আমার মাথায় এই বিষয়গুলি কেন প্রবেশ করান, তা যে শুধুই মানুষকে জানানর উদ্দেশ্যে সে বিষয়েও আমার মনে কোনপ্রকারের সন্ধেহের অবকাশ নেই। কারন ছাড়া কার্য হয়েনা। তা যদি আবার মায়ের কার্য হয় তবেতো তার কারন আরও ব্যপক এ কথাতো মানবেন। যাই হউক, বিষয়টিতে প্রবেশ করি। যে শক্তিকে বা পরমেশ্বরের যে রূপকে আমরা পূজা করি তার ঠিক সেই প্রকারের পূজার উপচার, স্থান ও নিয়ম নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অনেকের মতে ইহা হয়েতো ভন্ডামি। কিন্তু কেন তা নয়, এবং এইসকল উপচারের কিবা প্রয়োজন তার বিচার করছি। পরমেশ্বর ও তাঁর শক্তি সর্বত্র এতো জানাই হয়েছে। তাই একথা শোনা যায় যে যেকোন স্থানেই তাঁকে পূজা করা যায়। একথা সত্য। কিন্তু সাধারন মানুষ সেই কল্পনা সাধারন ভাবে করতে পারেনা, সেই মূর্তি বা তাঁর অপার শক্তির কল্পনা করতে পারেননা বলেই নানা মুর্তির প্রয়োজন হয়ে থাকে। যেমন আমি আগেই দুঃখ, রাগ, হাসি ইত্যাদি প্রকাশে নানা ধরনের ছবির ব্যাবহারের কথা বলেছি। তাই মন্দির, পূজার আয়োজন ইত্যাদির প্রয়োজনও আছে। ভেবে দেখুন, আপনাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে প্রচুর জানজটের মাঝে যদি কেউ মোবাইলে খুব ভালো কোন সিনেমা দেখায়, আপনার কি ততটা ভালো লাগবে যতটা ভালো লাগবে কোন মাল্টিপ্লেক্স সিনেমাহলে বসে, এসির শিতল হাওয়ায় পপকর্ন খেতে খেতে চিন্তা মুক্ত মাথায় দেখলে? সিনেমা দেখাটিকে এক্ষেত্রে যদি পূজা ধরি তবে সিনেমা হলটি হল মন্দির। পপকর্ন ও এসি হল পূজার সামগ্রী ইত্যাদি। এই কারনেই পূজার আয়োজনে সঠিক স্থানে তা হোলে সমগ্র মনটি তাতে নিবিষ্ট হয়ে যায়। ব্যাতিক্রম শুধু মহাপুরুষগন। তাঁদের কাছে রাস্তাতেও যে ঈশ্বর, মন্দিরেও তাই। কিন্তু সাধারন মানুষের কাছে এই কল্পনা অনেক কঠিন, তাই এই ব্যাবস্থা। এখন প্রশ্ন হল তবে কি স্থান মাহাত্য বলে কিছু নেই? সর্বস্থানে ঈশ্বর রয়েছেন, সর্বস্থানে তাঁকে পূজা করা গেলে বিশেষ বিশেষ স্থানে জ্যোতির্লিঙ্গ, সতীপিঠ ইত্যাদির কি তবে মাহাত্ম নেই? আছে বৈকি। তারও সহজ সরল উদাহরন স্বরূপ ব্যাখ্যা দি এইস্থানে। ধরুন আপনি ডাক্তার। আপনি রুগি চেম্বারে দেখেন, কলে যাননা। আপনার কোন রুগি যদি আপনাকে খুঁজতে অযথা কোন ভুল স্থানে না গিয়ে আপনার চেম্বারে ঠিক সময় আসেন তবে আপনাকে পাওয়ার সুযোগ থাকবে সেতো বলাই বাহুল্য। দেখুন, এখানে সময়েও একটা ব্যাপার। দিন, সময় ইত্যাদি। কারন ডাক্তারের সেই সময়, দিন ইত্যাদি স্থির থাকে। ঠিক এই কারনেই আবার বিশেষ বিশেষ দেবতার পূজারও দিন সময় ইত্যাদিও ঠিক করেছিলেন সেই মহাত্মাগন। যেমন সোমবার শিবের পূজা ইত্যাদি। এই হল স্থান, সময় ইত্যাদির মাহাত্ম। তবুও যাঁরা মহাত্মা, তাঁরা যেকোন সময় যেকোন স্থানেই একই ফল লাভে সমর্থ হন। এরও সরল উদাহরন আছে। আপনার রুগি যদি বিরাট কোন ব্যাক্তিত্য হন তখন আপনি নিজের সময় বা স্থানের বাইরে গিয়েও তাঁকে দেখতে যেতে পারেন। যেমন আপনাকে যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজের চিকিৎসার জন্যে ডেকে পাঠান, হয়েত আপনি সারা দেবেন। ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটে মহাত্মাদের ক্ষেত্রে। তাঁরা তাদের কর্ম দ্বারা এতই ওপরের স্তরে পৌঁছে গেছেন যেখানে ঈশ্বর তাঁদের ডাকে সারা না দিয়ে পারেন না। যেস্থানে যে অবস্থাতেই ডাকুন না কেন। এখন দেখুন ঈশ্বরের শক্তিভেদে ও রূপভেদে আবার স্থান, পূজা ইত্যাদির পদ্ধতি কেমন সুন্দর করে আমাদের পূর্বপুরুষগন সৃষ্টি করে গেছেন। সেই আলোচনা এবারে করা যাক।

মনে করা যাক কৃষ্ণের মূর্তি। তিনি তাঁর বাঁশি হাতে অপুর্ব সুন্দর সুরমাধুরিতে চারিদিকে মুখরিত করছেন। এই পরিবেশে যদি তাঁকে পূজা করা হয়, স্মরন করা হয়, শ্রদ্ধা জানান হয় তবে কেমন পরিবেশ প্রয়োজন? মনরম, সুগন্ধিতে ভরা, আনন্দে উন্মত্ত মনে, সঙ্গীতে বাদ্যে মুখরিত পরিবেশে। তাই নয় কি? আবার অপর দিকে খেয়াল করুন, মা তারা, ঈশ্বরের এই শক্তি রূপটি যে পরিবেশে কল্পনা করা হয়েছে তা শত্রু দমনে সমস্ত শত্রুর মস্তক ছিন্ন করে মা সকলকে রক্ষা করছেন। অর্থাৎ মা কোন স্থানে অবস্থান করছেন? কি রূপে? যেখানে চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে শত্রুদের মৃতদেহ। এখন ভেবে দেখুন প্রচুর মৃতদেহ কোথায় দেখা যায়? শ্মশানে। সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশ, যা ভাবলে মানুষের মন শিউরে ওঠে সেই পরিবেশের উপযুক্ত স্থান শ্মশানই। তাই না? আর তাই মা তারার ধ্যান, চিন্তন  ইত্যাদির ক্ষেত্রে উপযুক্ত স্থান বিহিত হয়েছে শ্মশান। ইহা কি অনুপযুক্ত হয়েছে? তাই যদি হবে তবে কৃষ্ণের ক্ষেত্রেও অনুপযুক্ত হওয়া উচিত? তাই নয় কি? এই কারনেই আমি বলি কৃষ্ণও যিনি কালীও তিনি।

এবারে মহাদেবের রূপকার্থ বর্ননা করছি। প্রলয় কর্তা অর্থে ঈশ্বরের নাম মহেশ্বর। কোন কিছুর সৃষ্টি হলেই ধ্বংস অবশ্যম্ভাবি। কিন্তু এই সৃষ্টি থেকে ধ্বংসের মাঝে কিছু সময় বা কালের ব্যাবধান থাকে। তাই মহাদেবকে একাধারে মহাকালও বলা হয়ে থাকে। আবার যিনি সকল ধ্বংসের কর্তা তাঁর কি নিজের কোন ধ্বংস থাকতে পারে? তাই শিবের আরেক নাম মৃত্যঞ্জয়। যাঁর মৃত্যু নেই। মহাদেবকে আদি দেব বলা হয়। এর তাতপর্য এই যে কাল সবসময় বর্তমান ছিল। যখন কিছুই ছিলনা তখনও কাল ছিল। তাই তিনিই ঈশ্বরের আদি রূপ। তিনিই যেহেতু ঈশ্বরের কালরূপে কল্পিত তাই তিনি সর্বজ্ঞ। কারন সমগ্র কালে তিনি ছিলেন তাই সব কালের কথাই তাঁর অবগত আছে। শিবের শক্তি হলেন মা কালী। তিনি শিবের ওপরে অবস্থিতা। শিব মা কালীর পায়ের নিচে শবরূপে অবস্থিত। “শবরূপ মহাদেব হৃদয়োপরিসংস্থিতাম” (মা কালীর ধ্যান মন্ত্রের অংশ)। এর কি ব্যখ্যা? এর ব্যখ্যা এই যে, যেন কোন মানুষের শরির থেকে শক্তি নির্গত হয়েছে আর তাই শক্তিবিহীন শরীরটি পরে রয়েছে শবরূপে। আর তাঁর সেই শক্তি তাঁর কার্যই সাধন করছেন। অর্থাৎ ধ্বংস কার্য। এই এর রূপকার্থ। ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরানের প্রকৃতি খন্ডেও ঐ কথাই বলা হয়েছে। “শিবশক্তস্তয়া শক্ত্যাশবাকারস্তয়া বিনা”। অর্থাৎ শিব শক্তিসহ থাকলেই শক্তিমান, নয়েত শবাকার হন। শিব শবরূপে শয়ন করে আছেন আর তাঁর শক্তি মা কালী তাঁর ক্রিয়া করছেন তাঁর শরীর থেকে নির্গত হয়ে। তাই শিবও যিনি, কালীও তিনি।

আগে বলেছি কৃষ্ণও যিনি কালীও তিনি, এখন শিবও যিনি কালীও তিনি প্রমান হওয়াতে বোঝা গেল শিব, কালী ও কৃষ্ণে কোনই ভেদ নেই। শুধু আমাদের মনের ভ্রান্ত ধারনায়, বোঝার ভুলে যতসব ভেদের সৃষ্টি হয়।

এবারে বিষ্ণুর রূপ। ঈশ্বরের সৃষ্টি কার্যের রূপই হলেন বিষ্ণু। তাঁর চারটি হাত। দুটি হাতে চক্র ও গদা, যা সৃষ্টি কার্যে বাঁধাদের দূর করার প্রতিক। আর দুহাতে শঙ্খ ও পদ্ম যা যথাক্রমে শত্রু দমনের পর শত্রু বিজয়ের প্রতিক ও শান্তির প্রতিক। কোমলতা ও সুন্দরতার প্রতিক। এবার লক্ষ করার মতন বিষয় হল, এই বিষ্ণুরই অবতার কৃষ্ণের কিন্তু দুটি হাত কল্পনা করা হয়েছে। কারন তিনি শত্রু নিধনে নন, বাঁশি হাতে একজন সুন্দর প্রেমিক রূপেই বেশি করে আমাদের আছে গ্রহনযোগ্য, আর তাঁকে সেইভাবেই কল্পনা করা হয়েছে। এইভাবে সেই মহান পূর্বপুরুষগন তাঁদের মহানুভবতার দ্বারায় নানা দেবদেবীর কল্পনা অতি নিপুন ভাবে করে ছিলেন। (এই স্থানেই একটি কথা বলি যে এইসব দেবদেবীর একএকজনেরই রূপকার্থ বোঝা বা তাকে বিশ্লেষন করার ক্ষমতা আমার নেই, এবং যদি কেউ তা করে থাকেন তবে একটি রূপের ব্যখ্যা দিতে গিয়েই সারা জীবন কেটে যাবে এনাদের রূপকার্থ এতই ব্যপক। তবুও আমার এই গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্যের খাতিরে এইটুকুই ব্যখ্যা দেওয়া উপযুক্ত মনে করি। এক্ষেত্রেও আমার উদাহরন প্রয়োগ করি। যেমন প্রথম শ্রেনীর কোন শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহ সম্পর্কে জানাতে গেলে শুধু তাদের নাম ও সামান্য কিছু বিষয় বলেই ছেড়ে দেওয়া হয়, গ্রহ সম্পর্কিত মহা মহা তথ্য তাদের জানান হয়েনা তারা কিছুই বুঝবেনা সেই কারনে, ঠিক তেমনই আমি নিজে আধ্যত্মিক জগতের একজন নিচু শ্রেনীর ছাত্র (হয়েত বা তাও নই) হয়ে, একজন প্রথম শ্রেনীর মানুষকে জানাতে গেলে এটুকুই ব্যাক্ত করা উপযুক্ত মনে করলাম।)

এইভাবেই যদি বিশ্লেষন করা যায় তবে দেখা যাবে যে আমরা প্রত্যেকটি দেবদেবীরই উৎপত্তির কারন ও মায়ের সেইসব শক্তিগুলির রূপ সম্পর্কে একটি সচ্ছ ধারনা পাব। যদিও তাঁরা সকলেই এক। শ্রী শ্রী সিতারাম দাস ওঙ্কারনাথ ঠাকুর একবার একটি দুর্গা মুর্তি দেখে এই বিষয়টিকেই কত সুন্দর করে বলেছিলেন “তাইত তোমায় চেনবার উপায় নাই, বাঁশি লুকিয়েছো , সে কাল রঙ আর নাই, দু’হাতের স্থানে দশ হাত করেছো, তিনটি নয়ন হয়েছে, পুরুষদেহ ত্যাগ করে রমনী হয়েছো, সবই ছেড়েছো, কিন্তু ত্রিভঙ্গ ঠামটি ত ছারতে পারনি! এইখানে ধরা পড়ে গেছো।” কত সরলভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে মা দূর্গাই শ্রীকৃষ্ণ।

এই সুত্র ধরেই একটা কথা মনে এলো যে বেশ কয়েকবছর আগে আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছিল দুর্গা মূর্তি দেখে যে দুর্গার সাথে চার ছেলে মেয়ের যে কাহিনী রয়েছে লোককথার ন্যায় তার বিষয়টা কি? পরে যখন জেনেছিলাম এঁরা সকলেই এক তখন আরো গুলিয়ে গেছিলো বিষয়টি যে তবে মা দুর্গার একার পুজা কেন করা হয়েনা। চারজনের কি প্রয়োজন। মায়ের দয়ায় তারও উত্তর পেয়ে গেলাম। মা দুর্গা শক্তি জেগেছিল অসুর নিধনে, দুর্গতির বিনাশকার্যের কারনে। কোন দুর্গতির বিনাশ কালে মা শক্তির থেকে দুর্গা নামে যে শক্তির উতপত্তি হয় তা পেলে আর্তিকের ন্যায় দুর্যয়, ভয়হীন, সেনাপতির ন্যায় সৌর্য বীর্য সম্পন্ন মানুষের তুল্য হয়ে যায়, তাই কার্তিকের রূপক সাথে থাকে। মহাশক্তির থেকে বহু সিদ্ধির লাভ হয়ে বলে সিদ্ধিদাতা গনেশের কল্পনা। আবার দুর্গতির নাশ হলে, অশুভ জ্ঞানের অন্ধকার কেটে গেলে শুভ জ্ঞানের আলোকে চারিদিক শ্বেতশুভ্র উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাই মা সরস্বতী দেবীর কল্পনা ও তৎসহ শোভা ও নানা সম্পদের প্রাপ্তির কারনে মা লক্ষী দেবীর কল্পনা বোধহয় যথার্থ। আর সর্বপরি মা দুর্গার মাথার ওপরে ভগবান মহাদেবের থাকার কারন, দুর্গতির বিনাশে, সমস্ত অন্ধকার নাশে, সেই মহান পরমপুরুষ কে আমরা লাভ করতে সমর্থ হতে পারব। তাই উর্গা মুর্তিতে নিচ থেকে উপরিস্থল অবদি শক্তির স্তবন, তার দ্বারা মা দুর্গতি নাশিনী মা শক্তির জাগরন, নানাবিধ কৃপা ও সিদ্ধি লাভ ও সবার ওপরে পরমপুরুষ পরমাত্মাকে লাভ করার ধাপ গুলিকেই একত্র করা হয়েছিল মহান সেই সব পুর্বপুরুষগনের দ্বারা।

এতবধি আলোচনা দ্বারা এই কথাটি তো স্পষ্ট হল যে নামরুপকার্থ কিভাবে পূর্বপুরুষগণ সৃষ্টি করে গেছিলেন। কিন্তু আমি বলছি বলেই যে তা মানতে হবে তা তো নয়, তার জন্যে প্রমানের প্রয়োজন আছে বৈকি। মহানির্বাণ তন্ত্র থেকে এই অংশটি দিলাম :

এবঙ্গুণান্যসারেণ রূপানি বিভিধানিচ

কল্পিতানি হিতার্থায় ভক্তানামল্পমেধসাং।

অর্থাৎ এইরূপ গুনের অনুসারে নানা প্রকার রূপ অল্পবুদ্ধি ভক্তদিগের নিমিত্ত কল্পনা করা হয়েছে

যাই হোক আমার আলোচনা ও রূপ কল্পনা ও তার অর্থ নিয়ে আরো দুচার কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি কারণ সেই বিষয় গুলি ভেবে আমার নিজেরই বড় অবাক লেগেছে। এতক্ষণের আলোচনায় এ বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে ভগবান পরমেশ্বরের নানা কার্যের ক্ষেত্রে পুরুষ রূপ ও তাঁর কার্য করার শক্তিকে স্ত্রী রূপে কল্পনা করা হয়েছে। যদি ভাবি মা সরস্বতী দেবীর কথা। আমাদের যখন সঙ্গীত সাধনার বা বাদ্য সাধনার ইচ্ছা জন্মায় তখন যে শক্তির মাধ্যমে আমরা সেই সাধনা করতে পারি তাই মা সরস্বতী। অধ্যাবসায়ের ক্ষেত্রেও একই কথা। তাই বিদ্যা, সঙ্গীত ইত্যাদির ক্ষেত্রে মা আদ্যাশক্তির সেই সগুণ শক্তির রূপই হলেন মা সরস্বতী। তাই মা সরস্বতীর পূজা বা স্তবন দ্বারা আমরা সেই কর্মগুলি করতে সক্ষম হব এর অর্থ যে আমরা মা অদ্যাশক্তির সেই গুনটিকে পেতে চাই যা মা সরস্বতী রূপে অঙ্কিত হয়েছে।

মা মনসার ব্যপারে ভেবে আমরা আরো অবাক লেগেছে যখন তাঁর বিষয় ভেবে কিছু সূত্র পেতে সক্ষম হয়েছি তাঁর কৃপায়। মা মনসা বিষহরি। সর্পের দেবী রূপে অঙ্কিতা। কিন্তু যদি আমরা একটু অন্য ভাবে ভাবি। আমাদের শরীরে কুণ্ডলিনী বলে একটি সুপ্ত শক্তি বর্তমান রয়েছে তা হয়েত অনেকেই জানি। যারা জানেননা তাদের জন্যে নাহয় পরে কোন এক পরিসরে আলোচনা করা যাবে। সেই কুণ্ডলিনী শক্তিকে অঙ্কিত করা হয়েছে সর্পের রূপে। সেই শক্তি জাগ্রত করার কথা আমরা  পাই নানা তন্ত্রে। যেখানে সেই শক্তিকে পূজা করা ও জাগরিত করার জন্যে পুরুষ রূপে ভগবান শিবকে পূজা করা হয়। এখন মা মনসাকে সর্পের দেবী বলার অর্থ এই নয় তো যে তিনি এই কুলোকুণ্ডলিনীর সাথে কোন ভাবে যুক্তা? আর তাঁকে ভগবান শিবের কন্যাও বলা হয়েছে। তাই শিবের সাথে তাঁর একটি সম্পর্কও রয়েছে। আবার আমাদের শরীরে রয়েছে সাতটি চক্র যা ভবিষ্যতে কুণ্ডলিনী নিয়ে আলোচনা করার পরিসরেই বলার অপেক্ষায় এখানে আর আলোচনা করলাম না। অর্থাৎ এই সাতটি চক্র সেই কুণ্ডলিনীর সাথে যুক্ত। আবার মনসা মঙ্গল কাব্যে দেখানো হয়েছে মা মনসার কোপে চাঁদ সদাগর বনিকের ৭ টি জাহাজই নষ্ট হয়েছিল। সংখ্যাটি অন্য কিছুও হতে পারতো। কিন্তু সেই ৭ ই ধরা হয়েছিল। আবার তাঁর কোপে বনিক সর্বস্ব হারিয়েছিলেন। অর্থাৎ তার মানে কি এমন কিছু দাঁড়ায় না যে এই কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগাতে পারলেই সেই ৭ টি চক্রকে রক্ষা করা সম্ভব? এখানে মা মনসার কোপ অর্থে কুণ্ডলিনী শক্তির অপব্যবহার বা নিঃব্যবহার। আবার সবকিছু হারান অর্থে যে শক্তি একজন মানুষ কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগরিত করলে পেতে পারেন তা না জাগানোর ফলে হারান। এমন চিন্তার আরেকটি কারনও আছে, মনসামঙ্গল কাব্য কিন্তু তন্ত্র আসার পর লেখা হয়েছে।তাই সেক্ষেত্রে এই কুণ্ডলিনী বিষয়টি থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

১৬৬৬-৭২ সালে স্যার আইজ্যাক নিউটন যখন আমাদের প্রথম দেখালেন যে প্রিজমের মাধ্যমে সূর্যালোক পড়লে ৭ টি রং বিচ্ছুরিত হচ্ছে, মানুষ তখন নিশ্চয়ই অবাক হয়েছিল এই বিরাট আবিষ্কার দেখে। কিন্তু ভেবে দেখুন সেই আবিষ্কারের কয়েক কয়েক হাজার বছর আগে হিন্দু ধর্মের সেইসব মহামানবের কোন অপার বুদ্ধির দ্বারায় সূর্যদেবের ৭ টি ঘোড়ার কল্পনা করেছিলেন? সূর্যদেবের রূপকার্থে তবে কি এই কথাটি বলাই যায়না যে তাঁর ৭ টি ঘোড়া তাঁর সেই সাতটি রঙেরই প্রতিক? আপনারাই ভেবে দেখুন। অবাক না হয়ে পারবেন না তাই না?

এইভাবে আলোচনা করতে থাকলে পাতার পর পাতা শুধু বিশ্লেষনই চলতে থাকবে।তাই এ বিষয় নিয়ে আর কিছু বলছিনা। ভবিষ্যতে আরো কিছু আলোচনা করার অপেক্ষায় নাম রূপকার্থ এখানেই সমাপ্ত করলাম।

তৃতীয় অংশ

দ্বিতীয় পর্যায়ঃ

আমাদের সকলের নানা ধরনের পছন্দের ও ভালবাসার বিষয়ে থাকে।কিন্তু ভেবে দেখবেন সেই বিষয়ে গুলিকে ভালবাসার কারণ কিন্তু সেই বিষয়েটি সম্পর্কে আপনার যথেষ্ট জ্ঞান থাকা।অর্থাৎ ধরুন আপনার কম্পিউটারটি আপনার কাছে খুব প্রিয় বস্তু।ভেবে দেখুন কেন তা আপনার প্রিয় বস্তু।কারণ আপনি তার কাজ সম্পর্কে অবগত।তার কি ক্ষমতা বা সে কি কি করতে পারে এবং তা আপনার কি কি কাজে আসতে পারে বা আসে তার সম্পর্কে আপনি যথেষ্ট অবগত।এই কারণেই তা আপনার কাছে প্রিয়। কিন্তু একজন, যে কম্পুটারের ব্যবহার জানেনা তার কাছে এই বস্তুটি ঠিক ততটা গুরুত্ব পাবেনা যতটা আপনার কাছে তার গুরুত্ব বা ভালবাসা আছে। এই উদাহরণটি দিলাম এই কারণেই আমরা আজ হিন্দু ধর্মে জন্মেও অনেকে আমাদের ধর্ম সম্পর্কে অনীহা প্রকাশ করি,তাকে মানতে চাইনা, ধর্মের কথা শুনতে চাইনা কেন এই কারণটি বিশ্লেষণ করার উদ্দেশে। এর কারণটি ঠিক ওই উদাহরনটির মতই। আসলে এর কারণ হল আমাদের নিজেদের ধর্ম সম্পর্কেই আমাদের ধারণা বা জ্ঞান সম্পূর্ণ নয়।তার সম্পর্কে আমাদের ধারণা পরিস্কার নয়।এই কারণেই আমরা মন থেকে তাকে ভালবাসতে পারিনা। যখন এই ধর্ম তার নিজের মধ্যেই সর্বৎকৃষ্ট তখন তা না জানার ফলেই আমাদের আজ এই ধর্ম সম্পর্কে অনীহা। যদি একবার এই ধর্মের শ্রেষ্টত্ব, তার মহত্ব সম্পর্কে জানতে পারি তখন আমরা মন থেকেই একে শ্রেষ্ঠ বলে মেনে নিতে পারব।এখন আমাদের কি অবস্থা সে সম্পর্কে আরেকটি সুন্দর উদাহরণ দি। ধরাযাক আমরা একটি কলেজের ছাত্র। সেই কলেজে এক নতুন প্রফেসর এলেন আমাদেরই বিষয়ের ওপরে। কিছু স্টুডেন্ট তার ক্লাস করলো এবং দেখল যে তিনি অসাধারণ পড়ান। যা বোঝান তা জলের মতন সহজ হয়ে যায় ছাত্রদের কাছে। আমরা সেই ব্যপারটা শুনলাম। অবগত হলাম তার পড়ানো নিয়ে। কিন্তু তখনও তার ক্লাস পাওয়ার সৌভাগ্য আমাদের হয়েনি। কিন্তু বাকিদের মুখে শুনে মনে মনে আমরা তাকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করলাম।এরপর একদিন তার ক্লাস পেলাম এবং নিজেরাও দেখলাম যে বাকিরা ভুল বলেনি। সত্যিই তিনি অসাধারণ। এবং আগে তার ক্লাস না পাওয়াকালীন তার প্রতি আমাদের যে শ্রদ্ধা ছিল, এখন নিজে তার ক্লাস করে সেই শ্রদ্ধা আরো বহুগুনে বেড়ে গেল। আমাদের ধর্মও ঠিক এই। এর সম্পর্কে শুনেই আমাদের মনে যে শ্রদ্ধা তা কেবল তার সম্পর্কে শুনে শুনে মনের মধ্যে তৈরী হওয়া “কৃত্তিম” শ্রদ্ধা। কিন্তু সত্যিকারের যেদিন তার ক্লাস পাব অর্থাৎ তাকে নিজের থেকে জানতে পারব সেদিন এই শ্রদ্ধা বহু বহু গুনে বৃদ্ধি পাবে। এই হলো অনুভুতি। অনুভূতিই সব। সেই সবথেকে বড় শিক্ষক। বই পরে জানা যায়। কিন্তু সত্যিকারের সেখা যায় একমাত্র অনুভুতি দিই। আমরাও বই পরে অঙ্ক করি। কিন্তু আইনস্টাইন হতে পারিনা। কারন তিনি অনুভুতি দিয়ে অঙ্ককে বুঝেছিলেন। নিজের করে নিয়েছিলেন। তাই তিনি ওই জায়গায় যেতে পারলেন। ধর্মতত্ত্ব তো আরো উপরে। বই পরে তাকে আর কি অনুভব করবেন। শুধু জানতে পারবেন তার সম্পর্কে।কিন্তু কখনো চেষ্টা করে দেখুন তাকে মন থেকে, হৃদয় থেকে অনুভব করবার। দেখবেন যা আপনি পেলেন তা এই পৃথিবীর সবথেকে দামী বস্তু। এই উদাহরনগুলির সুত্র ধরে এবার আমি এই গন্থের পরবর্তী দিকে প্রবেশ করতে চলেছি যেখানে আপনারা আমাদের হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়েতে যে জ্ঞানসকল প্রয়োজন তা জানতে পারবেন। এখানে আমি এবার বলব হিন্দু ধর্মের শাস্ত্রের কথা। লজ্জার বিষয় হল আমরা অনেকেই হিন্দু হয়েও, অনেক পুজো আদি করলেও কিন্তু হিন্দু শাস্ত্র যে কিকি তাই ভালকরে জানিনা। শুরুতে অন্তত সেটুকুও জানা উচিত বলে আমার মনে হয় তাই এই অধ্যায়ে আমি সেই আলোচনাতেই আসছি।

হিন্দু শাস্ত্র সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে শুরুতেই একটি বিষয় বলে নেওয়া আবশ্যক যে অনেকের এধরনের  ধারণা আছে যে হিন্দু শাস্ত্রের মধ্যে অনেক বিভেদ আছে, স্ববিরধিতা রয়েছে। কিন্তু তা যে কতখানি ভুল তা আমার পরবর্তী আলোচনা থেকেই সহজে বুঝতে পারবেন। হিন্দু শাস্ত্রের প্রতিটি গ্রন্থকে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করলে জানতে পারবেন যে পরব্রহ্মের উপাসনাই হিন্দু ধর্মের মূল সারমর্ম। সকল শাস্ত্র সমন্বয় এই কথায় বলে যে পরব্রহ্মের উপাসনা ছাড়া মুক্তিলাভ সম্ভব নয়। ব্রহ্মই হিন্দু ধর্মের মধ্যমনি। এখন শাস্ত্র কিকি তা সবিস্তারে আলোচনা করছি। বেদ হলো হিন্দু ধর্মের সর্বপ্রধান শাস্ত্র। যার ওপর নাম শ্রুতি। শ্রুতির অর্থ শোনা। পূর্বে গুরুর মুখ থেকে শিষ্য শুনে শুনে মনে রাখত। তখন লেখার প্রচলন ছিলনা। তাই এভাবেই এক পরম্পরা থেকে ওপর পরম্পরায় মুখ থেকে শুনে শুনে তা অধ্যায়ন করা হত বলে বেদের ওপর নাম শ্রুতি। আবার শ্রুতি কে মনে রেখে তা পরে বলা হত। একে বলা হত স্মৃতি। শ্রুতি অর্থাৎ বেদ দুটি অংশে বিভক্ত। মন্ত্র ও ব্রাহ্মন। মন্ত্রের ওপর নাম সংহিতা। সংহিতাতে ইন্দ্রাদী দেবতাদের স্তব আছে। ব্রাহ্মন হল সেই ভাগ যেখানে এই সংহিতার অর্থ ব্যাখ্যা করা আছে।এ বার বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার করে বলি। পূর্বেই বলেছিলাম যে তখনকার দিনে মূল বিশয়গুলিকেই রূপকের দ্বারা বলা হত। সেই সমস্ত রূপকের অর্থ উদ্ধার করতে পারলেই আসল অর্থ সামনে এসে পরে। যেমন এই গ্রন্থের আগের অংশে দেব দেবীর রূপকার্থ কিছু বিশ্লেষণ করেছিলাম। যেখানে এই ধরনের রূপকের ব্যবহার করে লেখা হত সেই ভাগটিকেই বলা হত সংহিতা। আবার এই রূপকের বিশ্লেষণ অর্থাৎ আসল মানেগুলি যে অংশে থাকত তাকেই বলা হত ব্রাহ্মন। এই ব্রাহ্মনেরই শেষ ভাগকে উপনিষদ বলা হয় থাকে। যেখানে একমাত্র অদ্বিতীয় ঈশ্বরের কথাই বলা আছে। বেদের অন্ত ভাগ বলে একে বেদান্তও বলা হয়। অনেকে ব্যাস প্রনীত বেদান্তসূত্রকে বেদান্ত বলেন। কিন্তু উপনিষদই হল আসলে বেদান্ত। বেদ চারটি, ঋক,সম,যজু: ও অথর্ব। ঋকবেদে দেবতাদিগের স্তব আছে। যজু: বেদে আছে যজ্ঞের বিধি। এবং সমবেদে আছে ধর্ম সঙ্গীত। অথর্ববেদে এসবই আছে। তার সাথে আছে বেশ কিছু শক্তিশালী মন্ত্র। যাদের মাধ্যমে অনেক অদ্ভুত কাজ করা সম্ভব। এইখানে একটি বিশেষ কথা স্মরণে রাখতে হবে যে সকল বেদ একই সময় একই ঋষির দ্বাড়ায় সম্পূর্ণ লেখা হয়েনি। এক এক সময় এক এক ঋষি উত্থিত হয়েছেন এবং মুখপরম্পরাগত শ্রুতিকে সংগ্রহ করে বেদ রচনা করেছেন। এই সকল শ্রুতি সংগ্রহকারিদিগের নাম ব্যাস। এই ব্যাস একজন ছিলেন না। অনেকের এটাই ধারণা যে ব্যাসদেব একজনই ছিলেন। কিন্তু সেই ধারণা ঠিক নয়। অনেকে আবার এও বলেন যে ব্যাসদেব নিজেরই লেখায় নানা জায়গায় নানা কথা লিখেছিলেন যাদের মধ্যে সাদৃশ্য ছিলনা। এবার আশা করি বোঝা যাবে যে তা একার দ্বাড়ায় লেখা ছিলনা। এভাবে অনেক ব্যাসের পর যিনি শেষে এসেছিলেন তাঁর নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। এতো গেল বেদের কথা। এবারে আসি পুরানের কথায়। মোট মহাপুরানের সংখ্যা ১৮। তাদের নাম: গরুর,কুর্ম,বরাহ,মার্কন্ডেয়,লিঙ্গ,স্কন্ধ,বিষ্ণু,শিব,মত্স,পদ্ম,ব্রহ্ম,ভাগবত,নারদ,অগ্নি,ভবিষ্য,বামন,ব্রহ্মান্ড,ব্রহ্মবৈবর্ত। এছাড়াও অনেক উপপুরাণ আছে। এসমস্ত পুরানের কাহিনী ইত্যাদি আলোচনা করলে ও বোঝার চেষ্টা করলে সহজেই বোঝা যাবে যে সবেতেই সেই সর্বশক্তিমান পরমাত্মার উপাসনারই কথা বলা হয়েছে। যেখানে বেদের উপনিষদ অংশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরাসরি পরমব্রহ্মের কথা আছে সেখানে পুরাণে সরাসরি সেভাবে না থাকলেও পুরোটাই প্রায় রূপকার্থে বর্ণনা করা হয়েছে।কিন্তু ভাব বা উদ্দেশ্য সেই এক। তন্ত্র হল সর্বাপেক্ষা আধুনিক শাস্ত্র।

হিন্দুধর্মের শাস্ত্র সম্পর্কে বলতে গেলে যাকে নিয়ে একটু বেশী আলোচনা করা উচিত তা হল ঋকবেদ। পৃথিবীর মধ্যে ঋকবেদ সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ। ঋকবেদের মধ্যে যদিও প্রকৃতির একাধিক বিষয়ে সমূহের মধ্যে ইশ্বর কল্পনা করে পূজার বিধি দেখা যায় তথাপি সে যুগের মানুষ যে একমাত্র একজন ইশ্বরের কথা জানতেন না তা ভুল। ঋগ্বেদের একটি লাইনে আছে : “সত্যং জ্ঞানং অনন্তং ব্রহ্ম”। এর থেকেই বোঝা যায় যে ঋগ্বেদ থেকেই একজন সত্য ব্রহ্মকেই উপাসনার কথা হয়ে এসেছে। সেই আদিম আর্যগণ সেই সময় থেকেই বুঝেছিলেন যে ঈশ্বর মানুষের পিতা মাতা। তিনিই সৃষ্টি কর্তা। তাই তাঁরা লিখেছিলেন “ত্বং হি ন: পিতা বসো ত্বং হিনো মাতা”। অর্থাৎ তুমিই আমাদিগের পিতা, তুমিই আমাদিগের মাতা। তাঁরা ঈশ্বরকে সখা হিসাবে বন্ধু হিসাবেও দেখেছিলেন। তাই লিখেছিলেন “সখা পিতা পিতৃতম: পিতৃনাম”। তাঁরা জেনেছিলেন ঈশ্বরের সখ্যতা সুস্বাদু। তাই বলেছেন “স্বাদু সখ্যং স্বাদ্বীপ্রনীতি:”। আবার সকলেই যে এক, অর্থাৎ যাকে বলা হয় অদ্বিতীয় বেদান্ত দর্শন তা ঋক্বেদের এই লাইনটি পড়লেই বোঝা যায়: “ত্বমস্মাকং তবাস্মি”, অর্থাৎ তুমি আমাদের ও আমরা তোমার।

চতুর্থ অংশ

মায়াবাদ

“নাস্তি সত্যাত পরোধর্ম্ম:”

সত্যজ্ঞান লাভ করা অপেক্ষা উত্কৃষ্ট ধর্ম সংসারে আর কিছুই নেই| সত্যজ্ঞান লাভেই মানুষের প্রকৃত মনুষ্যত্য লাভ হয় আর সেটাই মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত| আর আমি বারবারই এই কথাটা বলে এসেছি ও নিজেও মেনে এসেছি| সেই সত্যজ্ঞান অধ্মাত্যবিজ্ঞানে হোক, জড়বিজ্ঞানে বা জীববিজ্ঞানে হোক, যা সত্য তাকে জানতে তাকে মানতে সর্বদা চেষ্ঠা পাওয়া উচিত| আমার মতে আমরা যারা আস্তিক বা বলতে পারেন যারা অধ্মাত্য জীবনে, তার শক্তিতে বিশ্বাস রাখি, সেই পরমপুরুষ পরমব্রহ্ম পরমাত্মার কথা যারা মন থেকে হৃদয় থেকে মানি, তারাই প্রকৃত সত্যের সন্ধান করছি| কারণ? কারণ আমরা নিউটনকেও মানি আবার বিবেকানন্দকেও, আইনস্টাইন কেও মানি আবার রামকৃষ্ণকেও| কারণ আমরা সত্যকে মানতে জানি| কিন্তু সেইসব জড়বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষরা যারা বিজ্ঞানীকুলকেই মানেন কিন্তু অধ্মাত্মজ্ঞানী মানুষদের অবজ্ঞা করেন তারা অসত্যের পথেই হাটছেন| তারা সত্যকে জানার ভান করেন, অহংকার করেন কিন্তু আদেও কিছুই জাননেন না| কারণ এই মায়াময় জগতে সামান্য মানুষ হিসাবে কিছু আবিষ্কার বা কিছু অধ্যাবসায়েতেই সব শিক্ষা সব জ্ঞান লাভ হয়ে যায় না| তা শুধু সম্ভব একমাত্র সেই পরম্ব্রহ্মের কৃপায়| যা শুধু পাওয়া যেতে পারে তাকে বিশ্বাস করে, তারই দর্শিত পথ ধরে হাঁটলে| তাকে অবিশ্বাসের মতো “গোরায় গলদ” করে ফেললে সত্য জ্ঞান তো দুরের কথা, যা জানা গেছে তাও অসম্পূর্ণই থেকে যায়| মহান বিজ্ঞানী নিউটন এই বিষয় যথার্থ বলেছেন যে “এই বিশাল জ্ঞান সমুদ্রের তীরে আমি এখনো নুরি কুরাচ্চি মাত্র”| তবে ভেবে দেখুন আপনি বা আমি কে, যে গর্ব করে বলতে পারি আমি জ্ঞানী? পন্ডিতপ্রবণ সক্রেটিস বলেন “আমি এইটুকুই জানি, যে আমি সংসারের কিছুই জানিনা”| এর পর আর কি বা বলার থাকতে পারে? প্রকৃতির গুরো রহস্য় সম্পর্কে বহু ধারণা রাখা মহা কবি সেক্সপিয়ার অবদি বলেছেন “There are more things in heaven and earth than are dreamed of in your philosophy” – অর্থাত তোমার দর্শনশাস্ত্র যা কখন সপ্নেও ভাবতে পারেনা এমন অনেক বিষয় স্বর্গে ও মর্তে আছে| তাই এই বৈজ্ঞানিক যুগে থেকে যদি কেউ বিজ্ঞান শাস্ত্র অনুশীলন করে নানা বৈজ্ঞানিক সত্য লাভ করেন তিনিও সংসারে ধন্য হবেন| কারণ তিনি কোনো ভাবে তার সেই জ্ঞানের দ্বারা নিজের সাথে সাথে অপরেরও কল্যাণ করলেন| যেমন নিউটনের পূর্বেও বহু মানুষ আপেল যে গাছ থেকে মাটিতে পড়ে তা দেখে থাকবেন| কিন্তু সেই বিষয় নিয়ে এধরনের ভাবনা কারো মাথায় আসেনি| এলো নিউটনের মাথায়| এবং তার থেকে কৌতুহলী হয় তিনি যে সূত্রের অবতারণা করলেন আজ আমরা যে উন্নত বিজ্ঞানের যুগে বাস করছি সেটা বলতে গেলে তারই সেই অসাধারণ মস্তিকের কৃপায় প্রাপ্ত সুফলের সূত্র ধরে পাওয়া গেছে| আর এই কারণেই তিনিও আমার কাছে মহাপুরুষের মধ্যেই একজন| কিন্তু দু:খের বিষয়, ঠাকুর রামকৃষ্ণের সেখানো পথে চলে যেখানে কোটি মানুষের কল্যাণ হচ্ছে সেখানে কিন্তু এই বিজ্ঞানের গর্বে গর্বিত জন্মান্ধ মানুষেরা তাকে মহাপুরুষ হিসাবে মেনে নিতে বা শ্রদ্ধায় মাথা ঝোকাতে দ্বিধা করে| এবার ভেবে দেখুন তবে প্রকৃত সত্যজ্ঞানী বা সত্যসন্ধানী করা হলো? যাই হোক, এই পর্বে আমি এমন কিছু সত্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি যা একটি বৃহত অন্ধকারের মধ্যে আলোর দিশা দেখাতে সাহায্য করবে| একটি ঘন জঙ্গল, উদাহরণ স্বরূপ ধরুন আমাজনের সেই বিশাল ও ভয়ঙ্কর জঙ্গলের কথা| আপনাকে যদি সেই জঙ্গলের মাঝখানে ছেড়ে আশা হয়, ভেবে দেখুন আপনাকে সেখান থেকে বেড়িয়ে আসতে কত না বেগ পেতে হতে পারে| কিন্তু ভাবুন, আপনার সাথে একজন পথ প্রদর্শক থাকলো যে কিনা সেই জঙ্গল থেকে সহজে বেরুবার পথ জানে, তবে আপনার কি সুবিধাই না হবে তাই না? আর সেই পথপ্রদর্শক সেই হতে পারে যে সত্যজ্ঞানী হবে| অর্থাত যে সঠিক পথটা জানে| এই মানবজগত, এই পৃথিবী তেমনি অজানার মহা সমুদ্র| জীবন মরণের ঘরান্ধকারে পরিবেষ্টিত এক মহা ভয়ঙ্কর জঙ্গল| সেখান থেকে আপনি বেড়িয়ে আসতে পারবেন একমাত্র তেমনি কোনো সত্যজ্ঞানের দ্বারা| আর সেই সত্যজ্ঞান আপনি লাভ করতে পারেন একমাত্র সেই মহান পরমাত্মার সহায়তাতেই| তাই মানুষ হিসাবে সেই সত্যজ্ঞান লাভে উদগ্র ইচ্ছা সর্বদাই আমাদের থাকা উচিত| আর সেই ইচ্ছায় আমি যা জেনেছি তা এই অধ্যায় আমি জানাতে চলেছি আজকে| শুরুতে সেই সত্যটি নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি যার সম্পর্কে আমাদের আদেও স্পষ্ট ধারণা নেই| তার সত্যাসত্য তো পরের কথা, বিষয়টাই যেনো অন্ধকারে| আর তা হলো “মায়াবাদ”| আমরা শুনেছি এই পৃথিবী মায়াময়| মহামায়া আদি শক্তি আমাদের চোখে মায়ার বাধন দিয়ে রেখেছেন| যার ফলে আমরা প্রকৃত সত্য জানতে পারিনা| কিন্তু সেই মায়ার বাধন ছিন্ন হলে তবেই আমরা পেতে পারি সেই প্রকৃত সত্যের সন্ধান| কিন্তু কি এই “মায়া”| তা কি আমরা আদেও ভালোকরে জানি? তবে কিভাবে তাকে ছিন্ন করার চেষ্টা করব? মুক্তিই বা পাবো কিকরে তাকেই যদি না জানলাম? তাই সত্যজ্ঞানের রহস্য খোঁজার আগে আমাদের উচিত কি এই “মায়া” তা আগে জেনে নেওয়া| আমি এই পর্বে সেই চেষ্টাই করতে চলেছি মহামায়ারই দয়ায় ও প্রেরনায়| কারণ কিছুই তাঁর অগোচরে নেই এই মহাবিশ্বে, আর কিছুই তাঁর সাহায্য ছাড়া সম্ভবপর নয়|

জগত মায়াময়| আমাদের মা প্রকৃতি আমাদের যেটুকু দেখার ক্ষমতা দিয়েছেন আমরা সেটুকুই দেখতে পাই| তার ভিন্ন বেশি কিছু দেখার ক্ষমতা আমাদের চোখের নেই| যেমন, আমরা একটা গাছকে যেমন দেখি একটি পিপড়ে নিশ্চই সেই রূপ দেখেনা| আবার একটা কুকুর বা বিড়ালের চোখেও নিশ্চই গাছের রূপ একেবারে আমাদের মতো নয়| আচ্ছা, যদি ধরি হয়েত তারাও আমাদের মতই গাছকে দেখে, তাহলে বলি তবে জন্মান্ধর কাছে গাছের রূপ কি হবে বলুন দেখি? তারাতো দেখেইনি জীবনে গাছ কেমন দেখতে| শুধু অনুভব করেছে মাত্র| এবার তো নিশ্চই মানবেন যে তারা গাছকে একজন সুস্থ চোখের অধিকারীর ন্যায় অবশ্যই দেখেন না? তবে তাদের কাছেও এই গাছের একটা প্রকৃতি বা আকার রয়েছে| সেটা তাদের কল্পনার ভিত্তিতে গঠিত| তারমানে এই আলোচনায় এটা বোঝা গেলো যে আসলে গাছের যে কি রূপ তা আমরা কেউই জানলাম না| আমাদের এক একটা প্রাণীর চোখে তা একেক রকমের| হ্যা, এটা বলা যেতে পারে যে এই পৃথিবীতে যেহেতু আমরা, অর্থাত মানুষরাই সর্বাধিক উন্নত প্রাণী, তাই বলা যেতে পারে আমরা যা দেখছি সেটাই সবথেকে বেশি ঠিক| তবে এটাও ভেবে দেখা দরকার যে আমরা এই পৃথিবীর সবথেকে উন্নত প্রাণী ঠিকই কিন্তু সারা মহাবিশ্বেও কি আমরাই সর্বাধিক উন্নত প্রাণী? এটা এখনো একটা প্রশ্ন বটে| যাই হোক| এই মায়ার বিষয় আর কিছু আলোচনার আবশ্যকতা রয়েছে| আমরা চাঁদকে ছোটবেলা থেকে দেখছি| একজন শিশুর কাছে তার যে রূপ একজন কবির কাছে হয়েত তা নয়| কবি চাঁদের কলঙ্ক নিয়ে অনেক কবিতা লিখলেন ওপর দিকে বিজ্ঞানী মহলে আবিষ্কৃত হলো কলঙ্কগুলো আসলে কিছুই নয়, ওগুলো চাঁদের গায়ে বিভিন্ন আঘাতের ফলে সৃষ্ঠ কিছু গহ্বর ও খানাখন্দ মাত্র| অনেক দূর থেকে দেখার ফলে এই বিরাট সুবিশাল গর্তগুলিকেই কালো ছোপের মতো মনে হয়| তাহলে এবার আমরা যদি বিজ্ঞানীদের সঠিক মানি তাহলে সেই কবিরা বা সেই শিশু যা ভেবে ছিলো তা ভুল বলতে হবে| কবি যে চাঁদকে একজন সুন্দরী মেয়ের মখ আর ওই দাগ কে তার গালের তিলের সাথে তুলনা করেছিলো, বলতে হবে সেটা ভুল ছিলো| কিন্তু আসলে কোনটাই ভুল নয়| এই যে একেক জনের কাছে রূপের এই ভিন্নতা এটাকেই মায়া বলা হচ্ছে| আদেও কিন্তু কেউই সত্য রুপটা জানতে বা দেখতে পায়েনা| বলতে পারেন জেনেও দেখতে পায়না খালি চোখে| যেমন? যেমন ধরুন আজ আমরা শিক্ষিতরা এটা জানি যে আমাদের শরীর বহু কোষের সমষ্ঠি| কিন্তু দেখুন, আমরা খালি চোখে কি সেইসব কোষগুলি দেখতে পাই? আমরা জানি তা আছে, কিন্তু তাও আমাদের তা দেখতে অনুবীক্ষণ লাগে| কেন? কারণ এত ছোট বস্তু আমাদের চোখ দেখতে পায়না| তাহলে বলুন দেখি, আমরা এটা কিকরে বলি যে আমরা যা দেখি সবই সত্যি? মায়া নয়? তাই বলছি, সেই মায়া দেবী আমাদের যেটুকু দেখতে দিয়েছেন, আমরা সেইটুকুই দেখতে পাই| বেশিও না, কম না| এখন আমার মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দেয়, যে যা যা আমাদের দেখতে দেননা, সেগুলি কি তবে দেখার দরকার নেই? নাকি প্রয়োজন পরেনা? এত কিছু দেখাচ্ছেন, কিন্তু সবকিছু দেখাচ্ছেননা| নিশ্চই তো কারণ আছেই| সেটা তবে কি? সেটা নিয়ে পরেই নাহয় আলোচনা করা যাবে|

দেখুন, আমরা যত একটু একটু করে শিখতে শুরু করেছি, আমাদের সেখার ক্ষিদে ততই বেড়েছে, আর এটাই মানুষের সাধারণ প্রবৃত্তি| একটি শিশু যেমন অপার বিস্ময় সবকিছু নয়ন মেলে দেখে, কারণ তার কাছে তখন বেশির ভাগ বিষয়ই নতুন, তখন যেমন সে দেখে আর তার মা বাবাকে হাজার প্রশ্ন করে| কারণ এটাই মানুষের সাধারণ জন্মগত প্রক্রিয়া| এর তো নিশ্চই কোনো কারণ থাকবে? সেটা কি কারণ? কারনটা সোজা| ভগবান চেয়েছেন, যে মানুষকে তিনি পৃথিবীর সবথেকে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসাবে বানালেন, সে অন্যান্য প্রানীদের মতো না হয়ে বরং নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগাক| নিজেকে উন্নত করুক| তা নাহলে আর উন্নত প্রাণী কিসের| কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে যে এই সামান্য মানুষ যার দেওয়া শক্তিতে জানার ক্ষমতা পেলো, জ্ঞান লাভের শক্তি পেলো, সেই সামান্য মানুষই আজ বিজ্ঞানের গর্বে অন্ধ হয় সেই পরম শক্তিকে মানতে অস্বীকার করে| এবং মুক্ত কন্ঠে, উচ্চ কন্ঠে ঘোষণা করে ঈশ্বর বলে কিছু নেই| সব ভুও| তাই সেই বিজ্ঞানের সেবকদের বলি ধিক তোমাদের শিক্ষায়, যেখানে সর্বোচ্চ বিজ্ঞানী, সর্ব জ্ঞানের আকর, আধার সেই মহা শক্তিকে, পরমপুরুষকেই যদি না মানলে, না জানার চেষ্ঠা করলে তবে কি শিখলে জীবনে?

এভাবে শিখতে শিখতে আমরা সেখার পদক্ষেপগুলোকে যদি ভালো করে লক্ষ্য করি, বিশ্লেষণ করি, তবে দেখতে পাবো যে সেগুলি পরপর এগিয়েছে ধাপে ধাপে, কিন্তু একেবারে চুরান্ত পর্যায় এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পৌঁছতে পারেনি| যেমন? যদি চিকিত্সাবিদ্যায় বলেন, সব রোগের এখনো সম্পূর্ণ চিকিত্সা সম্ভব হয়নি| যদি পদার্থবিদ্যা বলেন, তবে এটা মানবেন নিশ্চই যে এই বিশ্বচরাচরে সব পদার্থ সম্পর্কেই নিশ্চই পৃথিবীর মানুষ ১০০ শতাংশ অবগত হতে পারেননি| তেমনি কি রসায়ন, কি জ্যোতির্বিদ্যা, সব স্থানেই দেখবেন এখনো বাকি, এখনো সেখার বাকি| অর্থাত এর যেন শেষ নেই| নিউটন যেখানে ছারলেন, আইনস্টাইন ধরলেন, তারপর তার থেকে আরেক বিজ্ঞানী, তারপর আরেক জন| এভাবে চলেই যাচ্ছে ও চলবেও ভবিষ্যতে| কারণ এই বিশ্বব্রহ্মান্ডকে অতো সহজে জানা সম্ভব নয়| এটা মানতে নিশ্চই দ্বিধা নেই যে কোষ আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ একটি পাতাকে পাতা রূপেই দেখত এখনো যেমন আমরা দেখছি| কিন্তু পার্থক্য হলো এই যে, তার ভেতরে যে সহস্র কোষ রয়েছে তা ছিলো ধারনার বাইরে যা এখন আমরা জানি| আবার যখন কোষ আবিষ্কার হলো তখন হয়েত ডি এন এ ছিলো ধারণার বাইরে| কে বলতে পারে হয়েত এমন কিছুও ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে একটি কোষ থেকেই যেটা এখনো আমাদের ধারণার বাইরে? অর্থাত আমি এটাই বলতে চাইছি যে এই পাওয়ার যেনো শেষ নেই| অর্থাত বলতে পারা যাবেনা যে আমরা জানার শেষ সীমায় পৌছে গেছি| তাহলে যদি বলি কোষ আবিষ্কারের পূর্বের মানুষ যারা কোষের সম্পর্কে ধারণা বিহীন থেকেও পাতাকে পাতা রূপেই দেখত তারা ভুল ছিলো, কারণ সেটার ভেতরেও অনেক কিছু আছে, তখন বলতে হয় যে কোষ আবিষ্কারের পরেও যারা ডি এন এ জানতোনা তারাও ভুল ছিলো| তাহলেতো এখনো বলতে পারি আমরাও যা দেখছি তাও ভুল বা সম্পূর্ণ নয়| কারণ হয়েত এর ভেতরেও কিছু থাকতে পারে যা আমরা এখনো জানতে পারিনি? তাহলে ভেবে দেখুন কি দাড়ালো| কিছুই নয়| দাড়াল এই, যে যতই বিজ্ঞানের কচকচানি জেনে নিজেদের পণ্ডিত মনে করুননা কেন, এবং  যারা এই বিশ্বে নিজেদেরই সর্বশক্তিমান ভাবেন ও ঈশ্বরকে মানেনা, তারাও সেই মায়াতেই অবোধ্য| না জেনেই| না মেনেই| কারণ তারাও কিন্তু সেই ভ্রান্ত বা সম্পূর্ণ আবিষ্কার না হওয়া অর্ধ জানা বিষয়কেই সম্পূর্ণ জানা বিষয় ভেবে সেই মোহে আবদ্ধ হয়ে রয়েছেন| এটাই মায়ার শক্তি| যে এনার পাশ থেকে কারো মুক্তি নেই| সে যত বড় পন্ডিতি হোক না কেন| কারণ…. ইনিই মহামায়া, আদি শক্তি|

এখন মায়া নিয়েতো অনেক কিছু কথা হলো| তার পুরভাগেই পেলাম একমাত্র চক্ষু নামক ইন্দ্রিয়কে| মূল দোষী রূপে| যে আমাদের সবকিছু পুরোপুরি দেখায় না| যেটুকু তাকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সেটুকুই দেখায় মাত্র| তবেকি মায়ার খেলায় চোখই একমাত্র দোষী বা দায়ী| না মোটেও না| আরো ৪ জন আছে| আসলে এই মায়ার ৫ টি দ্বার আছে| আর সেই ৫ টি দ্বারই হলো আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়| এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সবকিছুর পূর্ণ জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার ক্ষমতা না থাকার কারণে এরাই আমাদের সত্য পথ থেকে দুরে সরিয়ে রাখে, চোখে ঠুলি পড়িয়ে| ঠিক চোখে দেখার ক্ষেত্রে যেরূপ উদাহরণ দিয়েছিলাম, ভেবে দেখুন স্বাদে, গন্ধে প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা কিন্তু আলাদা আলাদা অনুভুতি প্রাপ্ত হই| কে জানে আমাদের কাছে লঙ্কার যা স্বাদ, একটি সাপের কাছে কি সেই একই স্বাদ হবে কিনা? যেখানে আমাদর জিহ্বায় তাদের তুলনায় অনেক বেশি কোরক থাকে| ভেবে দেখুন| এখানেও ধোকা| তারমানে আসলে যে কার কি স্বাদ তাও আমরা অনুমানই মাত্র করি| সম্পূর্ণ বলতে পারিনা| ঠিক গন্ধ, স্পর্শ সব ক্ষেত্রেই ব্যপারটা একই দাড়াবে| তাই এই পঞ্চ ইন্দ্রীয়ই হলো সেই অপরাধী যার কারণে আমরা মায়ার বাধনে অবোধ্য থাকি| এই সেই কারণ| আর এই কারণেই সব মহাপুরুষই আমাদের এই পঞ্চ ইন্দ্রীয়য়কে বশে আনতে বলেছেন প্রথমে| তবে যদি মায়ার বাধন ছিন্ন করা সম্ভবপর হয়|

চোখে দেখে যে সুখ বা দু:খ আমরা পাই তাও যে মনেরই ভ্রান্তি আর মায়া ছাড়া কিছুই নয় সে নিয়ে একটা সুন্দর উদাহরণ দি| ধরুন আপনাকে চোখ বেধে সুইজারল্যান্ডে ঘুরিয়ে আনা হলো| আপনি কি সেই অনুভুতি পাবেন যা যদি চোখ মেলে সুইজারল্যান্ডের সৌন্দর্য লক্ষ্য করেন? তারমানে স্থানে কিন্তু কিছু এলো গেলো না| দেখতে পেলেই সুখ| নাহলে কিন্তু যে অন্ধকারে সেই অন্ধকারেই থাকতে হয়| অর্থাত সব স্থানই সমান মনে হয়| এবার আপনি বলবেন তবে শরীরে অনেক আরাম অনুভব করেছিলাম| পরিশুদ্ধ বাতাস গায় লেগে না গরম না ঠান্ডার একটা তৃপ্তি পাচ্ছিলাম| এবার ভেবে দেখুন সেটা কার জন্যে? সেটা আপনার “ত্বক” নামক আরেক ইন্দ্রিয়ের জন্যে| সে তো আরেকজন দোষী| চোখ বাধা সত্যেও সে চাইলো কিছুটা হলেও আপনাকে মায়ায় জড়াতে| তাই সে সেই অনুভুতি করলো| সে রাস্তাও যদি চোখের মতই কোনো ভাবে বন্ধ করে দেওয়া যেত তাহলে দেখতেন সেই মায়ার বাধন কেটে যেত| এবার ভেবে দেখুন চোখ খুলে যে সৌন্দর্য দেখে আপনি মুগ্ধ হতেন, চোখ বাধা থাকায় তা কিন্তু হলেননা| অর্থাত বিচলিতও হলেননা| আপনাকে একটা কুশ্রী জায়গায়েও যদি চোখ বেধে নিয়ে যাওয়া হয় আপনার যা অনুভুতি হবে সুন্দরের ক্ষেত্রেও কিন্তু তাই হবে| এবার মহাপুরুষদের আরেকটি কথা ভেবে দেখুন যে কেন গীতায় অবদি বলা হয়েছে যে কোনো সময় উত্তেজিত হবেনা| সর্বস্থানে সর্বদা এক মনোভাবে অবিচল থাকবে| দুঃখেও যেমন কাঁদবেনা, আনন্দেও তেমন হাসবেনা| এটাই সেই কারণ| কারণ আদেও এসবের অস্তিত্যই নেই| সবই আমাদের ইন্দ্রিয়ের কারণ| তার জন্যেই যত সুখ দু:খ ইত্যাদির সৃষ্টি| আর এই বিষয়গুলিকে না জেনেই মুর্খেরা বলে, যে এগুলো পাগলের প্রলাপ| হাসি পেলে হাসবনা, কান্না পেলে কাদবনা, তাহলেতো সে পাগলই| কিন্তু তারা ভেবেও দেখেনা, আসলে এই হাসি কান্না সবই মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়| সবই একদিন শেষ হয় যাবে| তাই এসবই অর্থহীন| ক্ষনিকের উত্তেজনা ছাড়া আর কিছুই নয়|

২০১২ সালে লেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *