ওম (Om) – প্রথম অংশ (First Part)

প্রথম অংশ

সত্যকে জানা বা তাকে জানার চেষ্টা করা প্রত্যেকটি মানুষেরই উচিত। কারন সত্যই শিব। আর শিবই সুন্দর। “সত্যম শিবম সুন্দরম”। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত সেই সত্য যা সুন্দর তাকে জানার চেষ্টায় নিজেকে নিযুক্ত করা। তাতে একাধারে যেমন নিজের উন্নতি তেমনই উন্নতি সমাজের। কারন মানুষ সামাজিক জীব। মানুষের নিজের উন্নতি হলেই সমাজেরও কল্যান ও উন্নতি হতে বাধ্য। এখন তাই আমাদের উচিত সমাজের প্রতিটি মানুষকে সঠিক জ্ঞান দ্বারা উন্নত করে সমাজসংস্কার করা। ধর্মই হল পরম জ্ঞান। পরম সত্য। আমরা যদি মনে করি এই পৃথিবীতে একমাত্র আমাদের শাস্ত্রই সত্য অন্য সব ধর্মের ধর্মগ্রন্থ মিথ্যা বা ভুল তা সত্য নয়। বরং আমাদের এটাই জানা উচিত যে আমাদের শাস্ত্র যতদুর সুবিস্তৃত তা পৃথিবীর ওপর কোন ধর্মে নেই। হিন্দু ধর্ম কত বর ধর্ম আর তা কত মহত তা এই নিচের শ্লোক টি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যেখানে হিন্দু ধর্ম এমন একটি ধর্ম যা ওপর কোন ধর্ম কে ঘৃনা করার পরিবর্তে সকল ধর্ম কে ভক্তি ও ভালবাসতে অনুপ্রানিত করে:

ধর্ম্মং যো বাধতে ধর্ম্মো ন স ধর্ম্মঃ কুধর্ম্ম তৎ ।

[অবিরোধাত্তু যো ধর্ম্মঃ স ধর্ম্মঃ সত্যবিক্রম]।। বন ১৩১।১১

যে ধর্ম অন্য ধর্মের বিরোধী, তা কখনো ধর্ম নয়, তা কুকর্ম, পরস্পর অবিরোধী ধর্মই প্রকৃত ধর্ম।

আমার মতে কোন একটি বিশেষ মানুষ বা দল বা গোষ্ঠির কিছু সুন্দর কাজের মাধ্যমে সমাজের কিছু অংশের উন্নতি সাধন সম্ভব। কিন্তু সম্পুর্ণ উন্নতি নয়। তার জন্যে একমাত্র প্রয়োজন সবাইকে উন্নত করা। শিক্ষিত করা। শিক্ষিত মানে এই নয় যে লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত। কারন আজকাল এমন অনেকই তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ অশিক্ষিতের মতই আচরন করে। তাই পুঁথগত শিক্ষায় শিক্ষিত নয়, সেটাতো লাগবেই, তাছাড়া আত্মোন্নতি ও সত্যকে সঠিক ভাবে জেনে যে শিক্ষিত আমি তার কথাই বলছি। এবার প্রশ্ন হল এই শিক্ষা কিভাবে কোথা থেকে কি বিষয় এবং কি উপায় পাওয়া সম্ভব। আসুন সেই পথটিই প্রথমে খোঁজার চেষ্টা করি। শূন্য থেকে শুরু করি।

এই মহাবিশ্ব একটা বিপুল শক্তির ভান্ডার। একথা আজ বিজ্ঞানে প্রমানিত। এইক্ষনে এও প্রমানিত শক্তির সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই। তা এক শক্তি থেকে অন্য শক্তিতে পরিবর্তিত হতে পারে। এই পৃথিবী, চন্দ্র সূর্য, আরও কোটি কোটি গ্রহ নক্ষত্র সবইযে শক্তি থেকে সৃষ্টি একথা বিজ্ঞানে প্রমানিত। এই শক্তি (Energy) হলেন সেই মা আদ্যাশক্তি। তাই এনাকে আদি শক্তি বলা হয়। এই শক্তি সর্বত্র অবস্থিত। আমার শরীরে, আপনার শরীরে, এমনকি প্রত্যেকটি অনু পরমানুতে। আর এই কারনেই বলা হয় মা সর্বত্র বিরাজমানা। আমাদের সকলের মধ্যেই ভগবানের বাস একথার অর্থ এই যে সেই আদি শক্তির অংশ আমাদের সকলের মধ্যেই রয়েছে। যা সুর্যে, চন্দ্রে, পৃথিবীতে, মহাবিশ্বে রয়েছে, তাই আমাদের শরীরেও রয়েছে। তাই বলা হয়ে আমরা সকলেই এক। শক্তি সবস্থানে একই রূপে থাকেনা। শক্তির রূপ পরিবর্তন হয়। আকারে ভেদ হয়। আর এই কারনেই শক্তিতে কখনও মা কালী, কখনো মা দূর্গার রূপ কল্পনা করা হয়েছে। এখন এই শক্তি রয়েছে কোথায়? রয়েছে প্রকান্ড মহাবিশ্বে। ব্রহ্মাণ্ডে। এই ব্রহ্মান্ডই হল পরমেশ্বর পরমাত্মা। ভালোকরে লক্ষ করুন, পরমাত্মার মধ্যেই এই শক্তি। অর্থাৎ এঁরাও পৃথক নন। তাই বলা হয় অর্ধনারীশ্বর। এই শক্তিই প্রকৃতি। আর এই প্রকৃতি থেকেই আমাদের সৃষ্টি তাই বলা হয় আমরা সকলেই মায়ের সন্তান।”শ্রী শ্রী চন্ডী” গ্রন্থের “নমো দেব্য়ৈ মহাদেব্য়ৈ শিবায়ৈ সততং নমঃ| নমঃ প্রকৃত্য়ৈ ভদ্রায়ৈ নিয়তাঃ প্রণতাঃ স্মতাং ” মন্ত্র স্মরন করুন যেখানে “নমঃ প্রকৃত্য়ৈ” মন্ত্রে যথার্থই উল্লেখ রয়েছে যে মা-ই হলেন প্রকৃতি। প্রকৃতির মাঝে জল, বায়ু ইত্যাদি সব কিছুই মায়ের মধ্যেই অবস্থিত। তাই বলা হয় বিশ্বের সমস্ত স্থানে তিনি অবস্থিতা। তাঁরই সকল শক্তিকে নানা সময়, নানারূপে ও ব্যাবহারিক কারনের পার্থক্যে নানা দেবদেবীর কল্পনা করা হয়েছে। এই কারনেই তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর উৎপত্তির কারন। আসলে সবই সেই মা। তাঁরই নানা শক্তির নানা রূপ। এই ব্যপারটি পরিষ্কার হলেই সব দ্বন্দ কেটে যায়।

অর্থাৎ যিনি কার্য্য করছেন বা করাচ্ছেন তিনি সেই পরমপুরুষ আর যে শক্তির মাধম্যে সেই কার্য সম্পাদিত করছেন তাই শক্তি। বা প্রকৃতি। তাই উভয়েই এক। একে ছাড়া অপরে কিছু করা সম্ভব নয়। এই হল একেশ্বরবাদের মূল কথা। এইক্ষনে আমি আলোচনা করব কিরূপে শাস্ত্রকারগন এই ব্যাপারটিকেই রূপকের মাধ্যমে শাস্ত্রে এনেছেন, মায়ের এই নানা শক্তিকে কিরূপে তাঁরা রূপকের দ্বারা বর্ননা করেছেন।

প্রাচীন যুগে শূন্য তত্ত্ব অতি উত্তম ছিল। আজকের মানুষ ভাবে তারাই হয়েতো মহাবিশ্বের নানা রহস্য আবিষ্কার করতে পেরেছেন। কিন্তু সেযুগের লেখা পড়লে তারা হয়েতো লজ্জিত হবেন যে আমাদের শাস্ত্রে সেসব কথা বহু বহু যুগ পুর্বেই লিখিত হয়েছিল। কিরূপে? দেখুন। মহাবিশ্ব অনন্ত। যে আকাশ আমরা মাথার ওপরে দেখি তা যতই দিক চক্রবালে গিয়ে মিশে যাক না কেন তা যে এতেই সীমাবদ্ধ নয় তা কেমন জানতেন তখনকার মুনি ঋষিরা। সে কারনেই আকাশের নাম দিলেন “অনন্ত”। অনন্ত এই শূন্যের নামই অনন্ত দেব। পুরানে আছে অনন্ত নাগের ওপরে নাকি ব্রহ্মান্ড অবস্থিত। এর রূপকার্থ এই যে এই মহাবিশ্ব অনন্তে বা মহাশূন্যে অবস্থিত। আবার অন্তবৎ শূন্য হলেন কশ্যপ। আবার এই কশ্যপের সন্তান হলেন সূর্য্য, অর্থাৎ কত সুন্দর রূপকের মাধ্যমে বোঝালেন যে অন্তবৎ শূন্যের মাঝে সূর্য্য অবস্থিত এবং সৃষ্ট। অর্থাৎ সৌরমন্ডলটিকেই বলা হয়েছে কশ্যপ মুনি। অর্থাৎ সমগ্র মহাশূন্য হলেন অনন্ত দেব, শুধুমাত্র সৌরমন্ডলটি হলেন কশ্যপ। এবার ইন্দ্রতত্ত্ব বলছি। ইনি কশ্যপ অপেক্ষাও পরিমিত শূন্য। আমাদের মাথার ওপরে যে আকাশ দেখি ইনি তাই। সেইটুকু শূন্য হলেন ইন্দ্র। কিভাবে বুঝব বিষয়টি সঠিক বললাম? বলা হয়েছে আঁর চক্ষু একসহস্র তারা। আমরা খালি চোখে আমাদের মাথার ওপর সম সংখ্যক তারাই দেখতে পাই। শুধু এটাই নয়। আরও কারন রয়েছে। ইন্দ্রের অস্ত্র ও বাহন যথাক্রমে বজ্র ও ঐরাবত। ঐরাবত সাদা, যা শ্বেত ধ্ববল মেঘের প্রতিক। ইন্দ্রের আরেকনাম মেঘবাহন। অর্থাৎ মেঘ বাহন যার। এর থেকেও বোঝা যায় যে ঐরাবত মেঘেরই রূপক। ইরা শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ ইরাবত বা জলবৎ অর্থাৎ জলযুক্ত কোন পদার্থ অর্থাৎ মেঘ। ইন্দ্রের অস্ত্র বজ্র যে বাজের প্রতিক তা বোধকরি বোঝানোর অপেক্ষা রাখেনা। এবার একটা রূপক কাহিনী দেখুন। ইন্দ্র একবার বৃত্র নামে এক অসুরকে হত করেন। তাই তার আরেক নাম বৃত্রহর হয়। শুনেছিলাম বিদেশে আমাদের ধর্ম ও আমাদের শাস্ত্র নিয়ে অনেক গবেষনা হয়েছে এবং হয়ে চলেছে। যেখানে আমাদের দেশে তার কদর কমছে সেখানে বিদেশের বুদ্ধিমান মানুষদের কাছে এটা বুঝতে দেরি হয়েনি যে আমাদের শাস্ত্রে অনেক কিছু আছে। তাই তা নিয়ে তারা গবেষনা করছেন এবং যার ফল অনেকটাই আমাদের মতন জ্ঞানসন্ধানীরা পাচ্ছি। তার থেকেই এই রূপকটি জানতে পারি আমি। মহাবিদ্যান ম্যাক্সমুলার, যিনি বেদকে ইংরাজীতে অনুবাদ করেছিলেন প্রথম তিনি এই রূপকটি উদ্ধার করেছেন। তাঁর কথায় মেঘ থেকে যখন বৃষ্টি পরার পথে কোন প্রতিবন্ধক এসে গিয়ে বৃষ্টি হয়েনা তখন সেই অবস্থাকেই বলা হয়েছে বৃত্র। আর তখন বজ্রপাতের মাধ্যমে আবার সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি হলে তখন বলা হচ্ছে বৃত্রকে নাশ করেছেন। ভেবে দেখুন, এই কারনে লক্ষ করবেন যখন বৃষ্টির রেশ কমে আসে তখন বাজ পরলে আরো জোরে বৃষ্টি এসে যায়। আর ঠিক এই কারনেই কোন যায়গায় বৃষ্টি নাহলে মানুষে এখনো ইন্দ্রদেবের পূজা করেন। এই আলোচনায় বোঝা যাচ্ছে এই পূজা যথার্থ। কিন্তু ততসহ এটাও ঠিক যে তা বলে সেই পূজায় কোনরূপ কুসংস্কার বা ভীতি ইত্যাদি কোনকিছুই ঠিক নয়। পূজা যথার্থ বললাম এই কারনেই যে, যে শক্তি আমাদের বৃষ্টি দিয়ে মানুষকে প্রানে বাচাচ্ছে, ফসল হতে সাহায্য করছে, গরমের হাত থেকে রেহাই দিচ্ছে, তাকে যদি আমরা সন্মান করি তাতে ক্ষতি কিসের? আমাদের কি সামর্থ আছে যে যদি ক্ষরা হয় বা অনাবৃষ্টির কারনে ফসল না ফলে তাহলে সেই বৃষ্টি নামিয়ে এনে ক্ষরা মুক্তি ঘটান? যখন সেই ক্ষমতা নেই তখন সেই শক্তির কাছে মাথা নত করতে ক্ষতি কিসের? এইভাবে প্রতি ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে আমি চাই আমাদের ধর্মের মূল ব্যখ্যা তুলে ধরে কুসংস্কারের অন্ধকারটি দূরে সরিয়ে দিতে। যাতে যারা ইন্দ্রকে পূজা করতেন তারাও তাদের পূজা বজায় রাখেন কিন্তু সাথে কোন কুসংস্কারে বিশ্বাসী হলে তা দূরে সরিয়ে দেন এবং আরেকদিকে যারা ইন্দ্রকে মানেন না তারাও বোঝেন যে ইন্দ্র আসলে কিসের নাম। (অনেক মহামানব ইন্দ্রকে আবার আমাদের ইন্দ্রিয়ও বলে ব্যখ্যা করেছেন। সেকথা নাহয় পরে আসা যাবে। যেহেতু মা অর্থাৎ প্রকৃতি শক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে তাই আলোচনার তাল নষ্ট হওয়ার কারনে সেই আলোচনায় গেলাম না। )তখন দুপক্ষেই একটি একমুখিতায় আসতে পারে। এই আমার উদ্দেশ্য।

বলা হয়ে থাকে পরব্রহ্ম নিরাকার। আদ্যাশক্তি মাও নিরাকারা। তাহলে কিকরে এত দেবদেবী, এত অস্ত্রশস্ত্রে বা বিষয় সমুহে সজ্জিতা এবং নানা বাহনে অবস্থিতা? এর কারন বিশ্লেষন করি এবার। ধরুন আপনাকে কেউ দুঃখ কেমন দেখতে তা আঁকতে বলল। আপনি কি আঁকবেন? একজন কাঁদছে। তাইতো? কিন্তু কান্না টাই কি দুঃখ? ভেবে দেখুন তো। কান্না হল দুঃখের কারনে সৃষ্ট ফল। তার অভিব্যাক্তি। কিন্তু দুঃখ অন্তরের অনুভুতি। অনুভুতি অনুভব সাপেক্ষ। এর কোন রূপ নেই। তাই আপনি সেই অনুভুতি আঁকতেও পারবেন না। বরং তার ফলটিকে এঁকে বিষয়টি কি তা বোঝাতে চাইবেন। ঠিক তেমনই আনন্দ অনুভুতির ক্ষেত্রেও হাসির ছবি এঁকে বোঝাতে চাইবেন। ঠিক তেমনই ঈশ্বর নিরাকার, মা নিরাকারা, কিভাবে তাঁর সেই শক্তিকে আপনি আকবেন? তাই নানা রূপ কল্পনা করা হয়েছে তাঁদের শক্তিগুলিকে বোঝানোর উদ্দেশ্যে। এইভাবে ঈশ্বরের ও মাতৃশক্তির কার্য, সময়, স্থান ইত্যাদির পার্থ্যক্যে তাঁর নানা রূপের বর্ননা করা হয়েছে। এখন দেখুন এই কারনেই বলা হয়ে থাকে আপনি যাঁরই পূজা করুননা কেন, পূজা তিনিই পাচ্ছেন। এখন আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মতন। মানুষ যেহেতু তিনটি পৃথক গুনের সংমিশ্রনে সৃষ্ট তাই তাদের হেরফেরে মানুষের স্বভাবের, ইচ্ছারও হেরফের হয়। এটাই স্বাভাবিক। তাই সকলের পছন্দ বা চাহিদা ইত্যাদি সমান হয়েনা। আর ঠিক এই কারনেই নানা মানুষের ইষ্টদেবতা বা আরাধ্য দেবতার মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। আর সে কারনেই, এই চিন্তার বা ইচ্ছার ভিন্নতার কারনেই এত দেবদেবীর কল্পনা যদিও এরা সকলেই এক। আমাদের শাস্ত্রকারগন মনস্তাত্মীক বিদ্যায় এতটাই পারদর্শী ছিলেন যে এটা জানতেন যে সকলের সব গুন হয়েত পছন্দ হবেনা। যেমন হয়েত বৈষ্ণবগনের ক্ষেত্রে শ্মশানবাসী হয়ে যেমন তান্ত্রিক জীবনযাপন পছন্দ হয়েনা তেমন তন্ত্রে আবার মাংসাদি খাওয়া বিধিত যা বৈষ্ণবে নেই। এইটাই অনেকের মনে দ্বিধার সৃষ্টি করে ও এই প্রতিভাত হয় তাদের কাছে যে হিন্দুধর্মে অনেক স্ববিরোধিতা আছে। যদিও তা সঠিক নয়। আমার ওপরের আলোচনা থেকেই বুঝতে পারবেন যে তাঁর নানা স্থানের নানা রুপের কল্পনা। যাতে সকলেই, সে যে চাহিদার বা যে গুনেরই মানুষ হোক না কেন, তাঁর আরাধ্যকে ঠিকই পেয়ে যাবেন। এখন এই ব্যপারটিতে ভুল হতে পারে বা গুলিয়ে যেতে পারে যে কখন তাঁরা পুরুষ রূপ ও কখন স্ত্রী রূপ কল্পনা করেছেন। যখন সরাসরি ঈশ্বরের রূপ ভাবা হয়েছে তখন পুরুষ ও যখন সেই পুরুষের ক্রিয়া রূপ বা কার্যশক্তির রূপ কল্পনা করা হয়েছে তখন স্ত্রী রূপ। উদাহরন স্বরূপ ধরুন ইন্দ্র। ভগবানের মেঘ, বজ্র, বৃষ্টি ইত্যাদি সমন্নিত রূপকে যদি ইন্দ্র ভাবা হয়ে থাকে তবে তিনি যে শক্তির মাধ্যমে এই ক্রিয়া করেন অর্থাৎ বজ্রপাত করেন বা বৃষ্টি নামান সেই শক্তির নাম “ঐন্দ্রী”। তাহলে আরেকটি ব্যাপারও পরিষ্কার যে আমরা যদি বজ্র বা বৃষ্টির জন্যেও মায়ের শরনাগত হই, তাঁকে পূজা করি তবে তিনিই ইন্দ্রের শক্তি রূপে আমাদের তা দান করবেন। তাই তাঁকে এও বলা হয়েছে যে তিনিই অন্নপূর্না। অর্থাৎ যিনি আমাদের অন্ন দান করেন। অন্ন শস্য ফলনের জন্যে বৃষ্টি আবশ্যক। তাই নতুন শস্য উঠলেও অনেকে তাঁর পূজা করেন। “নতুন ধান্যে হবে নবান্ন তোমার ভবনে ভবনে”। এই পূজাও যথার্থ। কারন প্রকৃতির ইচ্ছা না হলে, সাহায্য না এলে, শস্য ফলানো আজ অবদিও সম্ভব হয়েনি মানুষের দ্বারা। তাই সেই মহান শক্তির নিকট মাথা নোয়াতে ক্ষতি কি?

অর্থাৎ যেখানে যেদিকে যা কিছু কার্যই হোক না কেন তা সেই মা। তাঁর শক্তি বিনা কিছুই করা সম্ভব নয়। তাই বলেছেন “তোমার কর্ম তুমি কর মা, লোকে বলে করি আমি”। তাহলে কি কর্ম আমি করি না? তবে পাপ পূন্য কেন আমার হবে? এই প্রশ্নও অনেকের মনে আসে যে যদি তিনিই সব করেন তাহলে পাপের ভাগি আমরা কেন? এর কারন কর্ম আমিই করছি। কিন্তু যে শক্তিতে করছি তা মাতৃ শক্তি। মায়ের শতিতে বলিয়ান হয়ে আমি ভালো করলে অবশ্যই মঙ্গল। আর খারাপ করলে? মায়ের শক্তির ভুল ব্যাবহারে কি পাপ হওয়া স্বাভাবিক নয়?

নাম নিয়ে আরও কিছু আলোচনা করা যাক যার ভেতর থেকে আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর বেড়িয়ে আসবে। আপনি একজন মানুষ। কিন্তু ভেবে দেখুন আপনারই কত রূপ। কিভাবে? আপনি কারও ছেলে। তখন মা বাবার কাছে আপনার একজন সন্তানের রূপ। তখন আপনার এই রূপের ক্রিয়া কি? ভক্তি, শ্রদ্ধা ইত্যাদি। এখন আপনি হয়েত কারও স্বামী। তখন আপনার ক্রিয়া প্রেম, ভালোবাসা, দায়িত্ব ইত্যাদি। আবার আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে আপনার রূপ বাবার ন্যায়। সেই অনুযায়ী আপনার ক্রিয়ারও ভেদ হবে। শুধু এই নয়, আপনার কর্মজগতে, অফিসে, রাস্তাঘাটে, বন্ধুদের কাছে, পাড়ার মানুষদের কাছে ইত্যাদি নানা যায়গায় নানা মানুষের কাছে আপনার নানা রূপ ও ক্রিয়া। এবার ভেবে দেখুন আপনি একজন সাধারন মানুষ হয়েই যদি আপনার এত মানুষের চোখে নানান বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে চরিত্র, ক্রিয়া ইত্যাদির ভেদ দেখা যায়, তবে যিনি সর্বস্ব, সর্বশক্তিমান, যিনি সবার ওপরে, তাঁর নানা রূপ নানা শক্তি কল্পনা কি নিরর্থক? আবার ঠিক একই কারনে একই রূপের আবার বহু নামও আছে। যেমন শ্রীকৃষ্ণের একশত আট নাম ইত্যাদি।

প্রকৃতির যে শক্তিতে দুষ্টের দমন হয়, দুর্গতির বিনাশকারি ঈশ্বরের সেই শক্তির রূপের নাম মা দুর্গা। এখন লক্ষ করুন, প্রকৃতির মাঝে পর্বত সবচেয়ে উচ্চ বস্তু। আর তার মধ্যে ভারতীয়দের কাছে সর্বচ্চ পর্বত হল হিমালয়। আর এই কারনেই সেই প্রকৃতি স্বরূপিনী মা দুর্গার পিতার নাম হিমালয়। কত অপুর্ব এই চিন্তা। যিনি বা যাঁরা এই কল্পনা করেছিলেন। আমরা শ্রী শ্রী চন্ডী থেকে জেনেছি যে মা কালীর উৎপত্তি হয় মা চন্ডীর কপালের তৃতীয় নেত্র থেকে। এই রূপকটির অর্থ নির্নয় করা যাক। মানুষের যখন প্রচন্ড রাগ উৎপন্ন হয় তখন কপালে ভাঁজ পরে। অর্থাৎ ভ্রূকুটি কুটির হয়। তাই এই কপাল থেকে মা কালীর উৎপত্তির মাধ্যমে প্রচন্ড রাগকেই বোঝান হয়েছে। যা প্রচন্ড ধ্বংসের প্রতিক। আর তাই মা কালী মহা প্রলয় বা ধ্বংসের দেবী রূপেই অঙ্কিতা হয়েছেন। এই প্রসঙ্গে আরোও একটি সুন্দর ব্যাখ্যা নিয়ে আসি যা আমার মাথায় যখন এসেছিল আমি নিজেই হতবাক হয়ে গেছিলাম। তা যে মায়ের কৃপাতেই আমার মাথায় এসেছিল তা বুঝতে অসুবধা হয়েনি। আর মা আমার মাথায় এই বিষয়গুলি কেন প্রবেশ করান, তা যে শুধুই মানুষকে জানানর উদ্দেশ্যে সে বিষয়েও আমার মনে কোনপ্রকারের সন্ধেহের অবকাশ নেই। কারন ছাড়া কার্য হয়েনা। তা যদি আবার মায়ের কার্য হয় তবেতো তার কারন আরও ব্যপক এ কথাতো মানবেন। যাই হউক, বিষয়টিতে প্রবেশ করি। যে শক্তিকে বা পরমেশ্বরের যে রূপকে আমরা পূজা করি তার ঠিক সেই প্রকারের পূজার উপচার, স্থান ও নিয়ম নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অনেকের মতে ইহা হয়েতো ভন্ডামি। কিন্তু কেন তা নয়, এবং এইসকল উপচারের কিবা প্রয়োজন তার বিচার করছি। পরমেশ্বর ও তাঁর শক্তি সর্বত্র এতো জানাই হয়েছে। তাই একথা শোনা যায় যে যেকোন স্থানেই তাঁকে পূজা করা যায়। একথা সত্য। কিন্তু সাধারন মানুষ সেই কল্পনা সাধারন ভাবে করতে পারেনা, সেই মূর্তি বা তাঁর অপার শক্তির কল্পনা করতে পারেননা বলেই নানা মুর্তির প্রয়োজন হয়ে থাকে। যেমন আমি আগেই দুঃখ, রাগ, হাসি ইত্যাদি প্রকাশে নানা ধরনের ছবির ব্যাবহারের কথা বলেছি। তাই মন্দির, পূজার আয়োজন ইত্যাদির প্রয়োজনও আছে। ভেবে দেখুন, আপনাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে প্রচুর জানজটের মাঝে যদি কেউ মোবাইলে খুব ভালো কোন সিনেমা দেখায়, আপনার কি ততটা ভালো লাগবে যতটা ভালো লাগবে কোন মাল্টিপ্লেক্স সিনেমাহলে বসে, এসির শিতল হাওয়ায় পপকর্ন খেতে খেতে চিন্তা মুক্ত মাথায় দেখলে? সিনেমা দেখাটিকে এক্ষেত্রে যদি পূজা ধরি তবে সিনেমা হলটি হল মন্দির। পপকর্ন ও এসি হল পূজার সামগ্রী ইত্যাদি। এই কারনেই পূজার আয়োজনে সঠিক স্থানে তা হোলে সমগ্র মনটি তাতে নিবিষ্ট হয়ে যায়। ব্যাতিক্রম শুধু মহাপুরুষগন। তাঁদের কাছে রাস্তাতেও যে ঈশ্বর, মন্দিরেও তাই। কিন্তু সাধারন মানুষের কাছে এই কল্পনা অনেক কঠিন, তাই এই ব্যাবস্থা। এখন প্রশ্ন হল তবে কি স্থান মাহাত্য বলে কিছু নেই? সর্বস্থানে ঈশ্বর রয়েছেন, সর্বস্থানে তাঁকে পূজা করা গেলে বিশেষ বিশেষ স্থানে জ্যোতির্লিঙ্গ, সতীপিঠ ইত্যাদির কি তবে মাহাত্ম নেই? আছে বৈকি। তারও সহজ সরল উদাহরন স্বরূপ ব্যাখ্যা দি এইস্থানে। ধরুন আপনি ডাক্তার। আপনি রুগি চেম্বারে দেখেন, কলে যাননা। আপনার কোন রুগি যদি আপনাকে খুঁজতে অযথা কোন ভুল স্থানে না গিয়ে আপনার চেম্বারে ঠিক সময় আসেন তবে আপনাকে পাওয়ার সুযোগ থাকবে সেতো বলাই বাহুল্য। দেখুন, এখানে সময়েও একটা ব্যাপার। দিন, সময় ইত্যাদি। কারন ডাক্তারের সেই সময়, দিন ইত্যাদি স্থির থাকে। ঠিক এই কারনেই আবার বিশেষ বিশেষ দেবতার পূজারও দিন সময় ইত্যাদিও ঠিক করেছিলেন সেই মহাত্মাগন। যেমন সোমবার শিবের পূজা ইত্যাদি। এই হল স্থান, সময় ইত্যাদির মাহাত্ম। তবুও যাঁরা মহাত্মা, তাঁরা যেকোন সময় যেকোন স্থানেই একই ফল লাভে সমর্থ হন। এরও সরল উদাহরন আছে। আপনার রুগি যদি বিরাট কোন ব্যাক্তিত্য হন তখন আপনি নিজের সময় বা স্থানের বাইরে গিয়েও তাঁকে দেখতে যেতে পারেন। যেমন আপনাকে যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজের চিকিৎসার জন্যে ডেকে পাঠান, হয়েত আপনি সারা দেবেন। ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটে মহাত্মাদের ক্ষেত্রে। তাঁরা তাদের কর্ম দ্বারা এতই ওপরের স্তরে পৌঁছে গেছেন যেখানে ঈশ্বর তাঁদের ডাকে সারা না দিয়ে পারেন না। যেস্থানে যে অবস্থাতেই ডাকুন না কেন। এখন দেখুন ঈশ্বরের শক্তিভেদে ও রূপভেদে আবার স্থান, পূজা ইত্যাদির পদ্ধতি কেমন সুন্দর করে আমাদের পূর্বপুরুষগন সৃষ্টি করে গেছেন। সেই আলোচনা এবারে করা যাক।

মনে করা যাক কৃষ্ণের মূর্তি। তিনি তাঁর বাঁশি হাতে অপুর্ব সুন্দর সুরমাধুরিতে চারিদিকে মুখরিত করছেন। এই পরিবেশে যদি তাঁকে পূজা করা হয়, স্মরন করা হয়, শ্রদ্ধা জানান হয় তবে কেমন পরিবেশ প্রয়োজন? মনরম, সুগন্ধিতে ভরা, আনন্দে উন্মত্ত মনে, সঙ্গীতে বাদ্যে মুখরিত পরিবেশে। তাই নয় কি? আবার অপর দিকে খেয়াল করুন, মা তারা, ঈশ্বরের এই শক্তি রূপটি যে পরিবেশে কল্পনা করা হয়েছে তা শত্রু দমনে সমস্ত শত্রুর মস্তক ছিন্ন করে মা সকলকে রক্ষা করছেন। অর্থাৎ মা কোন স্থানে অবস্থান করছেন? কি রূপে? যেখানে চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে শত্রুদের মৃতদেহ। এখন ভেবে দেখুন প্রচুর মৃতদেহ কোথায় দেখা যায়? শ্মশানে। সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশ, যা ভাবলে মানুষের মন শিউরে ওঠে সেই পরিবেশের উপযুক্ত স্থান শ্মশানই। তাই না? আর তাই মা তারার ধ্যান, চিন্তন  ইত্যাদির ক্ষেত্রে উপযুক্ত স্থান বিহিত হয়েছে শ্মশান। ইহা কি অনুপযুক্ত হয়েছে? তাই যদি হবে তবে কৃষ্ণের ক্ষেত্রেও অনুপযুক্ত হওয়া উচিত? তাই নয় কি? এই কারনেই আমি বলি কৃষ্ণও যিনি কালীও তিনি।

এবারে মহাদেবের রূপকার্থ বর্ননা করছি। প্রলয় কর্তা অর্থে ঈশ্বরের নাম মহেশ্বর। কোন কিছুর সৃষ্টি হলেই ধ্বংস অবশ্যম্ভাবি। কিন্তু এই সৃষ্টি থেকে ধ্বংসের মাঝে কিছু সময় বা কালের ব্যাবধান থাকে। তাই মহাদেবকে একাধারে মহাকালও বলা হয়ে থাকে। আবার যিনি সকল ধ্বংসের কর্তা তাঁর কি নিজের কোন ধ্বংস থাকতে পারে? তাই শিবের আরেক নাম মৃত্যঞ্জয়। যাঁর মৃত্যু নেই। মহাদেবকে আদি দেব বলা হয়। এর তাতপর্য এই যে কাল সবসময় বর্তমান ছিল। যখন কিছুই ছিলনা তখনও কাল ছিল। তাই তিনিই ঈশ্বরের আদি রূপ। তিনিই যেহেতু ঈশ্বরের কালরূপে কল্পিত তাই তিনি সর্বজ্ঞ। কারন সমগ্র কালে তিনি ছিলেন তাই সব কালের কথাই তাঁর অবগত আছে। শিবের শক্তি হলেন মা কালী। তিনি শিবের ওপরে অবস্থিতা। শিব মা কালীর পায়ের নিচে শবরূপে অবস্থিত। “শবরূপ মহাদেব হৃদয়োপরিসংস্থিতাম” (মা কালীর ধ্যান মন্ত্রের অংশ)। এর কি ব্যখ্যা? এর ব্যখ্যা এই যে, যেন কোন মানুষের শরির থেকে শক্তি নির্গত হয়েছে আর তাই শক্তিবিহীন শরীরটি পরে রয়েছে শবরূপে। আর তাঁর সেই শক্তি তাঁর কার্যই সাধন করছেন। অর্থাৎ ধ্বংস কার্য। এই এর রূপকার্থ। ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরানের প্রকৃতি খন্ডেও ঐ কথাই বলা হয়েছে। “শিবশক্তস্তয়া শক্ত্যাশবাকারস্তয়া বিনা”। অর্থাৎ শিব শক্তিসহ থাকলেই শক্তিমান, নয়েত শবাকার হন। শিব শবরূপে শয়ন করে আছেন আর তাঁর শক্তি মা কালী তাঁর ক্রিয়া করছেন তাঁর শরীর থেকে নির্গত হয়ে। তাই শিবও যিনি, কালীও তিনি।

আগে বলেছি কৃষ্ণও যিনি কালীও তিনি, এখন শিবও যিনি কালীও তিনি প্রমান হওয়াতে বোঝা গেল শিব, কালী ও কৃষ্ণে কোনই ভেদ নেই। শুধু আমাদের মনের ভ্রান্ত ধারনায়, বোঝার ভুলে যতসব ভেদের সৃষ্টি হয়।

এবারে বিষ্ণুর রূপ। ঈশ্বরের সৃষ্টি কার্যের রূপই হলেন বিষ্ণু। তাঁর চারটি হাত। দুটি হাতে চক্র ও গদা, যা সৃষ্টি কার্যে বাঁধাদের দূর করার প্রতিক। আর দুহাতে শঙ্খ ও পদ্ম যা যথাক্রমে শত্রু দমনের পর শত্রু বিজয়ের প্রতিক ও শান্তির প্রতিক। কোমলতা ও সুন্দরতার প্রতিক। এবার লক্ষ করার মতন বিষয় হল, এই বিষ্ণুরই অবতার কৃষ্ণের কিন্তু দুটি হাত কল্পনা করা হয়েছে। কারন তিনি শত্রু নিধনে নন, বাঁশি হাতে একজন সুন্দর প্রেমিক রূপেই বেশি করে আমাদের আছে গ্রহনযোগ্য, আর তাঁকে সেইভাবেই কল্পনা করা হয়েছে। এইভাবে সেই মহান পূর্বপুরুষগন তাঁদের মহানুভবতার দ্বারায় নানা দেবদেবীর কল্পনা অতি নিপুন ভাবে করে ছিলেন। (এই স্থানেই একটি কথা বলি যে এইসব দেবদেবীর একএকজনেরই রূপকার্থ বোঝা বা তাকে বিশ্লেষন করার ক্ষমতা আমার নেই, এবং যদি কেউ তা করে থাকেন তবে একটি রূপের ব্যখ্যা দিতে গিয়েই সারা জীবন কেটে যাবে এনাদের রূপকার্থ এতই ব্যপক। তবুও আমার এই গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্যের খাতিরে এইটুকুই ব্যখ্যা দেওয়া উপযুক্ত মনে করি। এক্ষেত্রেও আমার উদাহরন প্রয়োগ করি। যেমন প্রথম শ্রেনীর কোন শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহ সম্পর্কে জানাতে গেলে শুধু তাদের নাম ও সামান্য কিছু বিষয় বলেই ছেড়ে দেওয়া হয়, গ্রহ সম্পর্কিত মহা মহা তথ্য তাদের জানান হয়েনা তারা কিছুই বুঝবেনা সেই কারনে, ঠিক তেমনই আমি নিজে আধ্যত্মিক জগতের একজন নিচু শ্রেনীর ছাত্র (হয়েত বা তাও নই) হয়ে, একজন প্রথম শ্রেনীর মানুষকে জানাতে গেলে এটুকুই ব্যাক্ত করা উপযুক্ত মনে করলাম।)

এইভাবেই যদি বিশ্লেষন করা যায় তবে দেখা যাবে যে আমরা প্রত্যেকটি দেবদেবীরই উৎপত্তির কারন ও মায়ের সেইসব শক্তিগুলির রূপ সম্পর্কে একটি সচ্ছ ধারনা পাব। যদিও তাঁরা সকলেই এক। শ্রী শ্রী সিতারাম দাস ওঙ্কারনাথ ঠাকুর একবার একটি দুর্গা মুর্তি দেখে এই বিষয়টিকেই কত সুন্দর করে বলেছিলেন “তাইত তোমায় চেনবার উপায় নাই, বাঁশি লুকিয়েছো , সে কাল রঙ আর নাই, দু’হাতের স্থানে দশ হাত করেছো, তিনটি নয়ন হয়েছে, পুরুষদেহ ত্যাগ করে রমনী হয়েছো, সবই ছেড়েছো, কিন্তু ত্রিভঙ্গ ঠামটি ত ছারতে পারনি! এইখানে ধরা পড়ে গেছো।” কত সরলভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে মা দূর্গাই শ্রীকৃষ্ণ।

এই সুত্র ধরেই একটা কথা মনে এলো যে বেশ কয়েকবছর আগে আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছিল দুর্গা মূর্তি দেখে যে দুর্গার সাথে চার ছেলে মেয়ের যে কাহিনী রয়েছে লোককথার ন্যায় তার বিষয়টা কি? পরে যখন জেনেছিলাম এঁরা সকলেই এক তখন আরো গুলিয়ে গেছিলো বিষয়টি যে তবে মা দুর্গার একার পুজা কেন করা হয়েনা। চারজনের কি প্রয়োজন। মায়ের দয়ায় তারও উত্তর পেয়ে গেলাম। মা দুর্গা শক্তি জেগেছিল অসুর নিধনে, দুর্গতির বিনাশকার্যের কারনে। কোন দুর্গতির বিনাশ কালে মা শক্তির থেকে দুর্গা নামে যে শক্তির উতপত্তি হয় তা পেলে আর্তিকের ন্যায় দুর্যয়, ভয়হীন, সেনাপতির ন্যায় সৌর্য বীর্য সম্পন্ন মানুষের তুল্য হয়ে যায়, তাই কার্তিকের রূপক সাথে থাকে। মহাশক্তির থেকে বহু সিদ্ধির লাভ হয়ে বলে সিদ্ধিদাতা গনেশের কল্পনা। আবার দুর্গতির নাশ হলে, অশুভ জ্ঞানের অন্ধকার কেটে গেলে শুভ জ্ঞানের আলোকে চারিদিক শ্বেতশুভ্র উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাই মা সরস্বতী দেবীর কল্পনা ও তৎসহ শোভা ও নানা সম্পদের প্রাপ্তির কারনে মা লক্ষী দেবীর কল্পনা বোধহয় যথার্থ। আর সর্বপরি মা দুর্গার মাথার ওপরে ভগবান মহাদেবের থাকার কারন, দুর্গতির বিনাশে, সমস্ত অন্ধকার নাশে, সেই মহান পরমপুরুষ কে আমরা লাভ করতে সমর্থ হতে পারব। তাই উর্গা মুর্তিতে নিচ থেকে উপরিস্থল অবদি শক্তির স্তবন, তার দ্বারা মা দুর্গতি নাশিনী মা শক্তির জাগরন, নানাবিধ কৃপা ও সিদ্ধি লাভ ও সবার ওপরে পরমপুরুষ পরমাত্মাকে লাভ করার ধাপ গুলিকেই একত্র করা হয়েছিল মহান সেই সব পুর্বপুরুষগনের দ্বারা।

এতবধি আলোচনা দ্বারা এই কথাটি তো স্পষ্ট হল যে নামরুপকার্থ কিভাবে পূর্বপুরুষগণ সৃষ্টি করে গেছিলেন। কিন্তু আমি বলছি বলেই যে তা মানতে হবে তা তো নয়, তার জন্যে প্রমানের প্রয়োজন আছে বৈকি। মহানির্বাণ তন্ত্র থেকে এই অংশটি দিলাম :

এবঙ্গুণান্যসারেণ রূপানি বিভিধানিচ।

কল্পিতানি হিতার্থায় ভক্তানামল্পমেধসাং।।

অর্থাৎ এইরূপ গুনের অনুসারে নানা প্রকার রূপ অল্পবুদ্ধি ভক্তদিগের নিমিত্ত কল্পনা করা হয়েছে।

যাই হোক আমার আলোচনা ও রূপ কল্পনা ও তার অর্থ নিয়ে আরো দুচার কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি কারণ সেই বিষয় গুলি ভেবে আমার নিজেরই বড় অবাক লেগেছে। এতক্ষণের আলোচনায় এ বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে ভগবান পরমেশ্বরের নানা কার্যের ক্ষেত্রে পুরুষ রূপ ও তাঁর কার্য করার শক্তিকে স্ত্রী রূপে কল্পনা করা হয়েছে। যদি ভাবি মা সরস্বতী দেবীর কথা। আমাদের যখন সঙ্গীত সাধনার বা বাদ্য সাধনার ইচ্ছা জন্মায় তখন যে শক্তির মাধ্যমে আমরা সেই সাধনা করতে পারি তাই মা সরস্বতী। অধ্যাবসায়ের ক্ষেত্রেও একই কথা। তাই বিদ্যা, সঙ্গীত ইত্যাদির ক্ষেত্রে মা আদ্যাশক্তির সেই সগুণ শক্তির রূপই হলেন মা সরস্বতী। তাই মা সরস্বতীর পূজা বা স্তবন দ্বারা আমরা সেই কর্মগুলি করতে সক্ষম হব এর অর্থ যে আমরা মা অদ্যাশক্তির সেই গুনটিকে পেতে চাই যা মা সরস্বতী রূপে অঙ্কিত হয়েছে।

মা মনসার ব্যপারে ভেবে আমরা আরো অবাক লেগেছে যখন তাঁর বিষয় ভেবে কিছু সূত্র পেতে সক্ষম হয়েছি তাঁর কৃপায়। মা মনসা বিষহরি। সর্পের দেবী রূপে অঙ্কিতা। কিন্তু যদি আমরা একটু অন্য ভাবে ভাবি। আমাদের শরীরে কুণ্ডলিনী বলে একটি সুপ্ত শক্তি বর্তমান রয়েছে তা হয়েত অনেকেই জানি। যারা জানেননা তাদের জন্যে নাহয় পরে কোন এক পরিসরে আলোচনা করা যাবে। সেই কুণ্ডলিনী শক্তিকে অঙ্কিত করা হয়েছে সর্পের রূপে। সেই শক্তি জাগ্রত করার কথা আমরা  পাই নানা তন্ত্রে। যেখানে সেই শক্তিকে পূজা করা ও জাগরিত করার জন্যে পুরুষ রূপে ভগবান শিবকে পূজা করা হয়। এখন মা মনসাকে সর্পের দেবী বলার অর্থ এই নয় তো যে তিনি এই কুলোকুণ্ডলিনীর সাথে কোন ভাবে যুক্তা? আর তাঁকে ভগবান শিবের কন্যাও বলা হয়েছে। তাই শিবের সাথে তাঁর একটি সম্পর্কও রয়েছে। আবার আমাদের শরীরে রয়েছে সাতটি চক্র যা ভবিষ্যতে কুণ্ডলিনী নিয়ে আলোচনা করার পরিসরেই বলার অপেক্ষায় এখানে আর আলোচনা করলাম না। অর্থাৎ এই সাতটি চক্র সেই কুণ্ডলিনীর সাথে যুক্ত। আবার মনসা মঙ্গল কাব্যে দেখানো হয়েছে মা মনসার কোপে চাঁদ সদাগর বনিকের ৭ টি জাহাজই নষ্ট হয়েছিল। সংখ্যাটি অন্য কিছুও হতে পারতো। কিন্তু সেই ৭ ই ধরা হয়েছিল। আবার তাঁর কোপে বনিক সর্বস্ব হারিয়েছিলেন। অর্থাৎ তার মানে কি এমন কিছু দাঁড়ায় না যে এই কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগাতে পারলেই সেই ৭ টি চক্রকে রক্ষা করা সম্ভব? এখানে মা মনসার কোপ অর্থে কুণ্ডলিনী শক্তির অপব্যবহার বা নিঃব্যবহার। আবার সবকিছু হারান অর্থে যে শক্তি একজন মানুষ কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগরিত করলে পেতে পারেন তা না জাগানোর ফলে হারান। এমন চিন্তার আরেকটি কারনও আছে, মনসামঙ্গল কাব্য কিন্তু তন্ত্র আসার পর লেখা হয়েছে।তাই সেক্ষেত্রে এই কুণ্ডলিনী বিষয়টি থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এইভাবে আলোচনা করতে থাকলে পাতার পর পাতা শুধু বিশ্লেষনই চলতে থাকবে।তাই এ বিষয় নিয়ে আর কিছু বলছিনা। ভবিষ্যতে আরো কিছু আলোচনা করার অপেক্ষায় নাম রূপকার্থ এখানেই সমাপ্ত করলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *